বোমা কিংবা পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র কোন কিছুর ভয়ই ইরানি জাতিকে মনোবল এবং শক্তিকে দূর্বল করতে পারবে না -প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
তেহরান, ইরান | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালিয়ে ইরানি জাতিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সামরিক চাপের মুখেও দেশের জনগণের মনোবল ও জাতীয় সংহতি বজায় রাখা জরুরি। তবে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি তৈরি হলে প্রতিপক্ষ তাদের লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ পেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জাতীয় নার্স দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন। ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, তাঁর বক্তব্যে দেশের ওপর বাহ্যিক চাপ, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যা এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উঠে আসে।

‘বিভক্তি তৈরি হলে শত্রু তার লক্ষ্য অর্জন করবে’
পেজেশকিয়ান বলেন, সামরিক হামলা দিয়ে কোনো জাতিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বিভক্তি সৃষ্টি হলে তা জাতীয় শক্তি ও স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে।
তিনি বলেন, “বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র কোনো জাতিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ি, তাহলে শত্রু তার লক্ষ্য অর্জন করবে।”
ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যকে দেশের নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিপক্ষ দেশের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও বিদ্যমান সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে ইরানি সমাজের সংহতি দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে।
অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরলেন পেজেশকিয়ান
বক্তব্যে পেজেশকিয়ান ইরানের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ঘাটতি, জ্বালানি সমস্যা, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা, বাজেট ঘাটতি এবং পেনশন তহবিলের সংকট।
তাঁর দাবি, এসব সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে ইরানি জনগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির প্রত্যাশা করেছিল প্রতিপক্ষ। তবে পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের সহনশীলতা ও পারস্পরিক সংহতি সেই প্রত্যাশাকে ব্যর্থ করেছে।
বিশ্লেষণগতভাবে, অর্থনৈতিক সংকট ও জনসেবার সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করা ইরান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যার সমাধান এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা জনগণের আস্থা ও দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় চাপের অভিযোগ
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন উপায়ে দেশটির ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। পরিবহন ও যোগাযোগের পথ সীমিত করার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এসব পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি, ব্যাপ্তি ও প্রভাব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই বিষয়গুলোকে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নার্স ও চিকিৎসাকর্মীদের অবদানের প্রশংসা
জাতীয় নার্স দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পেজেশকিয়ান দেশের নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষের সেবা এবং দেশের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় যারা অবদান রেখেছেন, তাঁদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের অবদান উল্লেখ করে তিনি সংকটের সময়ে দায়িত্ববোধ, জনসেবা এবং সামাজিক সংহতির গুরুত্বও তুলে ধরেন।
জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান
পেজেশকিয়ান সরকারি কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য ও পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান, যা জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা শক্তিশালী করতে সরকারের হাতে থাকা সব ধরনের সম্পদ ও সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান, জনসেবার উন্নয়ন এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা দেশের সংহতি রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
সামরিক চাপের মুখে ঐক্য ও স্থিতিশীলতার বার্তা
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, সামরিক চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও জনগণের আস্থা জাতীয় স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি ইরানের জনগণকে বিভক্ত না হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন।
তবে প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য এবং ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়ে তাঁর বক্তব্য প্রেসিডেন্টের নিজস্ব মূল্যায়ন। এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে ইরানের মনোবল ও জাতীয় সংহতি বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান এবং জনগণের আস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, দেশের ভেতরে বিভক্তি এড়িয়ে সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবিলা করাই ইরানের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি (Mehr News Agency)





