রাশিয়ার জ্বালানি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্লজ্জ দ্বিচারিতা দেখিয়ে দিচ্ছে,যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপর ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করতে পারে না —মতামত
নয়াদিল্লি, ভারত | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
রাশিয়ার জ্বালানি কেনার কারণে ভারতকে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা পূরণে রুশ ডিজেল ব্যবহারের উদ্যোগ ওয়াশিংটনের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করছে নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। এ পরিস্থিতি ভারতের জন্য নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, রাশিয়ার জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রয়োজন দেখা দিলে একই ধরনের বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অনুমতি দেওয়া কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা, জ্বালানি বাজারের বাস্তবতা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বৈত নীতি নিয়ে আলোচনাকে সামনে এনেছে।
ইতিহাসেও দেখা গেছে অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাব
১৯৮০ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে মার্কিন শস্য বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তবে এই পদক্ষেপ মার্কিন কৃষকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে যুক্ত ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে শস্য বিক্রিও অব্যাহত রাখে।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো তুলে ধরে বিশ্লেষকেরা যুক্তি দেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রুশ জ্বালানি কেনা নিয়ে ভারতকে চাপ
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশটির অপরিশোধিত তেলের চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা ভারতের জ্বালানি সরবরাহের বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশলের একটি অংশ।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (CREA) তথ্যের বরাত দিয়ে মূল নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টে ভারত রাশিয়া থেকে ৪১০ কোটি ইউরো মূল্যের অপরিশোধিত তেল কিনেছিল। একই নিবন্ধে জাতিসংঘের বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্যের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির মূল্যের ৩৩ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি থেকে আয় কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র রুশ তেল কেনা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে আসছে। এর ফলে ভারতের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ও জ্বালানি নীতি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল চুক্তি ঘিরে বিতর্ক
মূল নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (OFAC) একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স জারি করে রুশ ডিজেল সরবরাহের অনুমতি দেয়। নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এই ব্যবস্থার মেয়াদ ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রবন্ধটির বর্ণনা অনুযায়ী, রাশিয়া কয়েক ধাপে ডিজেল সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে ডিজেলের ঘাটতি এই উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মূল লেখায় দাবি করা হয়েছে, ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালনে ৬.২৮ ডলারে পৌঁছেছিল, যেখানে এক বছর আগে তা ছিল ৩.৬৮ ডলার। তবে এই মূল্যতথ্য, লাইসেন্সের শর্ত এবং প্রস্তাবিত সরবরাহের পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে রুশ ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে ভারতকে রুশ জ্বালানি কেনার জন্য চাপ দেওয়ার নীতির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেলের বাণিজ্যিক কাঠামো এক নয়; তাই দুটি ব্যবস্থার আইনি শর্ত ও বাস্তব পরিস্থিতিও আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য: রুশ আয় কমানো, নাকি সরবরাহ বজায় রাখা?
রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দেশটির জ্বালানি খাত থেকে আয় সীমিত করা, যাতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়ন কমানো যায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ বজায় রাখার বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে।
এ কারণে নিষেধাজ্ঞার নীতিতে প্রায়ই একটি দ্বন্দ্ব দেখা যায়। রাশিয়ার আয় কমাতে জ্বালানি বাণিজ্যে বাধা দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যেতে পারে। আবার সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য ছাড় দেওয়া হলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় করার সুযোগও বজায় থাকে।
মূল নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাতের কর-রাজস্ব ১৭ শতাংশ কমে ৫.৪৭ ট্রিলিয়ন রুবলে নেমেছে। এই পরিসংখ্যান এবং এর পেছনের কারণগুলো প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় সামনে আসে।
প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা। কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরবরাহব্যবস্থাকে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সংকটের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শোধনাগারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনায় রাখা। ভারতের অনেক শোধনাগার বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের উপযোগী। ফলে তেলের ধরন, দাম ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা আমদানির সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, বাণিজ্য আলোচনায় লিখিত নিশ্চয়তা চাওয়া। সাময়িক ছাড়ের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পষ্ট শর্ত নিশ্চিত করা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
চতুর্থত, কৌশলগত মজুত বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা। আন্তর্জাতিক সংঘাত বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পর্যাপ্ত মজুত জ্বালানির তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
পঞ্চমত, জ্বালানির বাইরেও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা। প্রযুক্তি, আর্থিক লেনদেন, সরবরাহব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একই ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বৃহত্তর প্রভাব
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতা রয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও জ্বালানি আমদানি নিয়ে মতপার্থক্য দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেও নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদেরও নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
সব মিলিয়ে, রুশ জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং ভারতের ওপর চাপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিকতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা, কৌশলগত মজুত শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় স্পষ্ট নিশ্চয়তা আদায় করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনটি সরবরাহ করা মতামতধর্মী লেখার ভিত্তিতে প্রস্তুত। ২০২৬ সালের SRIA আইনের স্বাক্ষর, OFAC-এর লাইসেন্স, রুশ ডিজেল সরবরাহের পরিমাণ, জ্বালানির মূল্য এবং রাজস্বসংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে সরকারি নথি ও নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। -দ্য গ্লোবাল জার্নাল





