Breaking
২৭শে অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ দেশটির শক্তিশালী পাঁচ শীর্ষ নেতা -কোনঠাসা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু

২৭শে অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ দেশটির শক্তিশালী পাঁচ শীর্ষ নেতা -কোনঠাসা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু

Share:

Written By

News Desk

২৭শে অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ দেশটির শক্তিশালী পাঁচ শীর্ষ নেতা -কোনঠাসা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু

তেল আবিব, ইসরায়েল | ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল

ইসরায়েলের আগামী ২৭ অক্টোবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন দেশটির পাঁচ শীর্ষ বিরোধী নেতা। তবে নির্বাচনী কৌশলে ঐক্য গড়লেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, গাজায় যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সামরিক অভিযান নিয়ে তাঁদের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর তেল আবিবে বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের বাসভবনে বৈঠকে বসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, ইয়ার গোলান এবং আভিগদর লিবারম্যান। তাঁরা লাপিদের সঙ্গে একটি পারস্পরিক অনাক্রমণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর আওতায় নির্বাচনের আগে একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রচারণা এড়িয়ে চলা এবং নির্বাচনের পর সরকার গঠনে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেন।

বৈঠকের পর প্রকাশিত ঘোষণায় নেতারা বলেন, মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও সংস্কার ও পুনর্গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি ‘জায়নবাদী ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ সরকার’ গঠন তাঁদের অভিন্ন লক্ষ্য। তবে ভবিষ্যৎ সরকারপ্রধান কে হবেন এবং জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। 

ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শিবির, কিন্তু নীতিগত পার্থক্য কতটা?

নেতানিয়াহুবিরোধী এই শিবিরে ডানপন্থী, মধ্যপন্থী ও বামপন্থী—বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সরকারের বিকল্প হিসেবে তাঁরা যে নীতি তুলে ধরছেন, তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের অবস্থানের বেশ কিছু মিল রয়েছে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নেতাদের কেউই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। ডেমোক্র্যাটস পার্টি বিষয়টিকে ভবিষ্যতের একটি অনির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে স্বীকার করলেও অন্য নেতাদের অবস্থান আরও কঠোর। গাজা ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়েও তাঁদের অধিকাংশ সমালোচনা মূলত সরকারের কৌশল, কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ঘিরে। 

লন্ডনের কিংস কলেজের ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, বেনেট, লিবারম্যান ও আইজেনকোটের মতো নেতারা মূলত ডানপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কেন্দ্রীয় বিষয় হলেও বিরোধী নেতারা সেটিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

গাদি আইজেনকোট — ইয়াশার পার্টি

গাদি আইজেনকোট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের কৌশল, বিশেষ করে ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।

২০২২ সালে বেনি গ্যান্টজের ন্যাশনাল ইউনিটি জোটের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও, যুদ্ধ শেষ করার সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জুনে গ্যান্টজের সঙ্গে পদত্যাগ করেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি ইয়াশার পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি পেশাদার সরকার, সবার জন্য সামরিক পরিষেবা—অতি-গোঁড়া ইহুদিদেরও অন্তর্ভুক্ত করে—এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের পক্ষে।

তবে আইজেনকোট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ও যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতার সমালোচনা করলেও, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মৌলিক লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশ্যে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলেননি। নির্বাচনের পর আরব দল রা’আমকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ — বেয়াহাদ জোট

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ ২০২৬ সালের এপ্রিলে বেয়াহাদ বা ‘একসঙ্গে’ নামে যৌথ নির্বাচনী জোট গঠনের ঘোষণা দেন। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তাঁরা নেতানিয়াহুর দুই মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ মাস সরকার পরিচালনা করেছিলেন।

বেনেট অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের দীর্ঘদিনের সমর্থক। অন্যদিকে, লাপিদ মধ্যপন্থী ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানে পার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তাঁদের নির্বাচনী অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।

গাজায় যুদ্ধ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন লাপিদ। তবে এসব অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে তাঁর আপত্তি তুলনামূলকভাবে সীমিত। বেনেট ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জোরালো সমর্থক এবং ২০২৫ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই নেতা এখন কেবল জায়নবাদী দলগুলোর সমন্বয়ে সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।

আভিগদর লিবারম্যান — ইসরায়েল বেইতেনু

আভিগদর লিবারম্যান ১৯৯৯ সালে ইসরায়েল বেইতেনু পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি মূলত রুশভাষী অভিবাসীদের মধ্যে ডানপন্থী সমর্থন গড়ে তুলেছে। একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থাকলেও বর্তমানে তিনি তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার বিরোধী।

লিবারম্যান অতি-গোঁড়া ইহুদি দল এবং আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠনেরও বিরোধিতা করেন। গাজা নিয়ে তাঁর অতীত বক্তব্য ও লেবাননে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান তাঁকে বিরোধী শিবিরের অন্যতম কঠোর ডানপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বিরোধিতা তাঁকে এই জোটে যুক্ত করলেও, তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ জোট-সমীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকেরা এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে তিনি আবার নেতানিয়াহুর ডানপন্থী শিবিরে ফিরে যেতে পারেন।

ইয়ার গোলান — ডেমোক্র্যাটস পার্টি

পাঁচ নেতার মধ্যে ইয়ার গোলানকে জায়নবাদী বামপন্থার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। তিনি ২০২৪ সালে লেবার ও মেরেতজ পার্টির একীভবনের মাধ্যমে গঠিত ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক উপপ্রধান গোলান সরকারের যুদ্ধকৌশল নিয়ে অন্য বিরোধী নেতাদের তুলনায় বেশি সমালোচনা করেছেন।

২০২৫ সালের মে মাসে গাজায় শিশুদের হত্যার বিষয়ে তাঁর একটি মন্তব্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিতর্ক সৃষ্টি করে। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি বক্তব্যটির ব্যাখ্যা দেন।

গোলান ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে অন্য নেতাদের তুলনায় বেশি উন্মুক্ত হলেও, তাঁর অবস্থানও একরৈখিক নয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আরব বালাদ পার্টির নেতা সামি আবু শাহাদেহকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন।

এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েলি রাজনীতি বিশেষজ্ঞ রই জুরের মতে, নিরাপত্তা ও সংঘাত নিয়ে গোলান ও লিবারম্যানের মতপার্থক্য থাকলেও, ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের সমীকরণে দুজনই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন। দুজনই নেতানিয়াহুর বিরোধী এবং অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির বিরোধিতা করেন।

নেতানিয়াহুর সামনে চ্যালেঞ্জ, বিরোধীদেরও সীমাবদ্ধতা

২৭ অক্টোবরের নির্বাচন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। পাঁচ বিরোধী নেতার সমন্বিত প্রচেষ্টা তাঁর বিরুদ্ধে একটি কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তবে নেতৃত্বের প্রশ্ন, আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সরকারের নীতিগত অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য জোটটির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও উল্লেখ করেছে, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো—বিশেষ করে রা’আম—সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহু এবং প্রধান বিরোধী নেতাদের অনেকে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটে যেতে অনিচ্ছুক। এই অবস্থান নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। 

সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে ইসরায়েলের পাঁচ বিরোধী নেতার ঐক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ঘটনা। তবে তাঁদের মধ্যে সহযোগিতার অঙ্গীকার থাকলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, গাজা যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সামরিক নীতি নিয়ে মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি সীমিত। ফলে সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তন ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু ফিলিস্তিন ও আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ে কতটা নীতিগত পরিবর্তন ঘটবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য টাইমস অব ইসরায়েল ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যম।

দ্য গ্লোবাল জার্নাল