নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৬ পেলেন ৮৫ বছর বয়সী দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট আইনজ্ঞ নাভানেথেম নাভি পিল্লাই
অসলো, নরওয়ে | ৯ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার নরওয়ের নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। পিল্লাই ভারতীয়-তামিল বংশোদ্ভূত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্মগ্রহণ করেন। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন এবং আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোবেল কমিটির মতে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এমন এক সময়ে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হলো, যখন আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।

কে এই নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই?
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয়-তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। বর্ণবৈষম্যপূর্ণ অ্যাপার্টহাইড শাসনামলে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি অর্জন করেন।
তিনি ইউনিভার্সিটি অব ন্যাটালে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাটাল প্রদেশে নিজস্ব আইনচর্চা প্রতিষ্ঠা করেন পিল্লাই। অ্যাপার্টহাইডবিরোধী কর্মী ও রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। দেশটির হাইকোর্টে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে তাঁর নিয়োগ দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনে অবদান
পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রুয়ান্ডাবিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিনি এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যাসংক্রান্ত ঐতিহাসিক এক মামলায় ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার নজির প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি মানবাধিকার সুরক্ষা, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং সংঘাতের মধ্যে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেন।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতিত্ব করেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালে তাঁকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় অ্যাড হক বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মামলাটিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। তবে নোবেল কমিটি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অপরাধের জন্য দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে পুরস্কার প্রদানের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বিশ্বমঞ্চে
দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপার্টহাইড আমলে পিল্লাই বর্ণবৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষা এবং বৈষম্যের শিকার মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিকাশের যোগসূত্র রয়েছে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ও জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি জাতীয় বিচারব্যবস্থা থেকে বৈশ্বিক আইনি কাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেছেন।
নোবেল কমিটির বার্তা: শান্তির জন্য আইনের শাসন জরুরি
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসন শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাত নিরসনের জন্য অপরিহার্য। শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনকে মূল্যায়ন করে কমিটি বলেছে, তাঁর স্বাধীনতা, আইনি দক্ষতা ও দৃঢ়তা আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার নাভি পিল্লাইয়ের কয়েক দশকের আইনি ও মানবাধিকারবিষয়ক কাজকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে দায়িত্ব পালন—তাঁর কর্মজীবন আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে বিশ্ব আলোচনার কেন্দ্রে তুলে ধরেছে।





