বলসোনারোকে পরাজিত করে ঐতিহাসিকভাবে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুলা দা সিলভা
ব্রাসিলিয়া, ব্রাজিল | ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা পেয়েছেন বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ, আর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই জয় ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ব্রিকসের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে লুলার নতুন মেয়াদ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনে প্রত্যাবর্তনের দাবি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় দফায় ভোটের ফল পাল্টে যায় এবং লুলা এগিয়ে যান।
লুলার প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সপ্তাহান্তে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর প্রস্তাব, পরিবারের ঋণ পুনর্বিন্যাস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে লুলা তাঁর বিজয়কে ‘অস্বীকারবাদী রাজনীতির পরাজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ব্রাজিলের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা করেন।
নির্বাচনী ফল নিয়ে বিরোধ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরাজয়ের পর ফ্লাভিও বলসোনারো ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন। ভোটদানের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এদিকে, নির্বাচনের দিন গণপরিবহন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগে ব্রাজিলের পাঁচটি রাজ্যে তদন্ত চলার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি এবং সেগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইকৃত তথ্য প্রয়োজন।

ব্রিকসের ভবিষ্যতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
লুলা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিকসকে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সহযোগিতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বহুমুখিতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সমর্থন করে আসছেন।
২০২৫ সালে রিও ডি জেনেইরোতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনের পর ব্রাজিল ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি জোটের সভাপতিত্ব ভারতের হাতে তুলে দেয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় একতরফা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ, পশ্চিম এশিয়ায় সংযমের আহ্বান এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন ও জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্লাভিও বলসোনারো এর আগে ব্রিকসে ব্রাজিলের সদস্যপদ পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে লুলার জয় সত্য হলে ব্রাজিলের বর্তমান ব্রিকসনীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে জোটের সদস্যদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলোর ঐকমত্য, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় তাদের সমন্বিত অবস্থানের ওপর।
ভারত-ব্রাজিল সম্পর্ক: বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ
লুলার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লুলার ভারত সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, খনি, স্বাস্থ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ও ব্রাজিল ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১৫ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ভারত চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে ব্রাজিলের বিরল মৃত্তিকা উপাদান ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বাণিজ্যিক ফলাফলে রূপ দিতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও কূটনৈতিক ভারসাম্য
ব্রাজিল ও ভারত—উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির প্রভাব মোকাবিলা করছে। প্রদত্ত প্রতিবেদনে ব্রাজিলের পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ এবং ব্রিকস-সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিষয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লুলা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতির সমালোচনা করে আসছেন। অন্যদিকে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
লুলার নেতৃত্বে ব্রাজিল যদি ব্রিকসের সহযোগিতা ও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্ব অব্যাহত রাখে, তবে ভারতের সঙ্গে এসব বিষয়ে সমন্বয়ের সুযোগ থাকতে পারে। তবে দুই দেশের নীতিগত অগ্রাধিকার সব ক্ষেত্রে এক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সংসদীয় চ্যালেঞ্জ
প্রতিবেদনে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, সরকারি ঋণ এবং সংসদে রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
লুলার নতুন সরকারকে বাজেট, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হতে পারে। একই সঙ্গে কংগ্রেসে পর্যাপ্ত সমর্থন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আইন ও অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
পরবর্তী পরিস্থিতি
লুলার কথিত বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হলে ব্রাজিলের ব্রিকসনীতি এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও খনিজ সহযোগিতার ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও দুই দেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত নির্বাচনী ফল, ভোটের পরিসংখ্যান এবং নির্বাচনী বিরোধের বিবরণ প্রকাশের আগে ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্টের (টিএসই) আনুষ্ঠানিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দিয়ে যাচাই করা জরুরি।
সূত্র: ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা প্রতিবেদন; ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক তথ্য যাচাই সাপেক্ষে।





