অতঃপর দীর্ঘ ৪বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নভেম্বরে আবারও আবুধাবিতে শান্তি বৈঠকে বসছেন রাশিয়া-ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্র
আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন করে জোরদার হচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনায় বসার পরিকল্পনা করেছে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে তিন দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
আল-জাজিরার ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা আলোচনা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। সম্প্রতি মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করার পর আলোচনার উদ্যোগ আবারও গতি পেয়েছে।
আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী মস্কো ও কিয়েভ
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফেরার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিয়েভের প্রত্যাশা, নতুন আলোচনা শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুদ্ধ বন্ধ এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার হামলা প্রতিরোধে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তার পথও তৈরি করবে।
অন্যদিকে, মস্কো যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। রাশিয়ার বক্তব্য, একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি সমাধানে পৌঁছাতে উভয় দেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের বিরোধিতা করছে এবং ইউক্রেনের ভূখণ্ডসংক্রান্ত দাবিতে অনড় রয়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন তার সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন করে রুশ হামলা ঠেকানোর নিশ্চয়তা চাইছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনায় ফেরাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের পর নতুন বৈঠকের পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
তবে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপের কিছু অংশে উদ্বেগ রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এবং ইউক্রেনের ওপর সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপের ফলে কিয়েভের নিরাপত্তা স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যপ্রাপ্তি নিয়ে মার্কিন প্রযুক্তি ও সহায়তার ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা স্টারলিংক ও সংশ্লিষ্ট সামরিক নেটওয়ার্কে বিধিনিষেধের খবর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে শান্তি আলোচনার পাশাপাশি ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে মানবিক অগ্রগতির ইঙ্গিত
রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের মতো মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। ২৩ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে ২৭০ জন যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের খবর পাওয়া গেছে। এ ধরনের বিনিময় দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করলেও তা বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার নিশ্চয়তা দেয় না।
এর আগে অনুষ্ঠিত আলোচনাগুলোতে যুদ্ধের অবসান, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রশ্নে মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। নতুন বৈঠকেও এসব বিষয় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শান্তিচুক্তির পথে এখনো বড় বাধা
আবুধাবির সম্ভাব্য বৈঠককে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় একটি নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে দুই পক্ষ কতটা আপস করতে প্রস্তুত, যুদ্ধবিরতির শর্তে ঐকমত্য গড়ে ওঠে কি না এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—তার ওপর।
ইউক্রেনের জন্য ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ; অন্যদিকে রাশিয়া নিজেদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত দাবিকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা সহজ হবে না।
নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে তা দীর্ঘ বিরতির পর তিন দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনায় ফেরার সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু যুদ্ধের অবসান ঘটাতে শুধু বৈঠক আয়োজনই যথেষ্ট নয়। স্থায়ী শান্তির জন্য গ্রহণযোগ্য শর্ত, কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে উভয় পক্ষের সদিচ্ছা অপরিহার্য।
সূত্র: আল-জাজিরা, ২৩ অক্টোবর ২০২৬; ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের বক্তব্য।





