নতুন আমদানি চুক্তির আওতায় ২০২৩ সালের পর এই প্রথম রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে ৪০ হাজার টন ডিজেলবাহী তিনটি ট্যাংকার
ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র | ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
নতুন আমদানি চুক্তির আওতায় রাশিয়ার প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে তিনটি ট্যাংকার। ২০২৩ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার মধ্যে এই চালানকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও মস্কোর জ্বালানি বাণিজ্য এবং দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক এ তথ্য জানান। রয়টার্সের বরাতে তিনি বলেন, রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (আরডিআইএফ) উল্লেখযোগ্য সহযোগিতায় ডিজেলবাহী প্রথম তিনটি ট্যাংকার আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর মস্কোর সঙ্গে ডিজেল আমদানি চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর এই চালান যাত্রা শুরু করল। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চুক্তিটিকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
প্রথম চালানের গন্তব্য ও পরিমাণ
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার প্রথম ট্যাংকারটি নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রার সংকেত দিয়েছে। জাহাজটি আগামী ৭ নভেম্বর সেখানে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী নোভাক এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রথম চালানে তিনটি ট্যাংকারে মোট ৪০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও চালানটির যাত্রা শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পেসকভ বলেন, প্রথম তেলবাহী ট্যাংকারটি ক্রেতাদের উদ্দেশে যাত্রা করেছে এবং নিয়মিত সরবরাহও অব্যাহত থাকবে।
এপি-র হিসাব অনুযায়ী, ৪০ হাজার টন ডিজেল প্রায় ৩ লাখ ব্যারেলের সমান। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। সেই হিসাবে প্রথম চালানের পরিমাণ দেশটির এক দিনের মোট ডিজেল ব্যবহারের আনুমানিক ৭ শতাংশের সমান।
নোভাক আরও জানিয়েছিলেন, অক্টোবর মাসে রাশিয়ার কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করতে পারে। তবে এই পরিমাণ সরবরাহ বাস্তবে সম্পন্ন হবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী চালান ও চুক্তির বাস্তবায়নের ওপর।

ট্রাম্প-পুতিন সমঝোতা ও জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগকে ট্রাম্প প্রশাসনের মস্কো-সংক্রান্ত জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
অন্যদিকে, গত মাসে ট্রাম্প রাশিয়ার জ্বালানি কেনে এমন শীর্ষ পাঁচ দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিধানসহ একটি বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে সই করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরে এসব পদক্ষেপ স্থগিত রাখা হয়।
এ অবস্থায় রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি চাহিদা, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অগ্রাধিকারের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ইউক্রেনের সমালোচনা, যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক বিতর্ক
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তির ঘোষণার পর ইউক্রেনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চুক্তিটিকে ‘শক্তিশালী অংশীদারদের দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে সমালোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের নেতাদের কাছ থেকেও ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা এসেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মার্কিন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগগুলোর আইনি ভিত্তি বা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে জেলেনস্কি যথেষ্ট আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন ট্রাম্প। এর ফলে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
জ্বালানি বাজারে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এই চালান?
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডিজেল ব্যবহারকারী দেশ। পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে আমদানির নতুন উৎস যুক্ত হওয়া দেশটির জ্বালানি সরবরাহে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে প্রথম চালানের প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক ব্যবহারের তুলনায় সীমিত। তাই এই চালান একাই দেশটির জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই।
চুক্তির পরবর্তী চালানগুলো নিয়মিত আসে কি না, আমদানির মোট পরিমাণ কত হয় এবং বাজারে ডিজেলের সরবরাহ ও দামের ওপর কী প্রভাব পড়ে—সেগুলোই হবে এই উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাশিয়ার ডিজেলবাহী তিনটি ট্যাংকারের যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা তাই কেবল একটি বাণিজ্যিক ঘটনা নয়; এটি একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।





