দুই পা হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে ছোট্ট গর্তে লুকিয়ে ছিলেন আট মাসেরও বেশি সময়—ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকোর বেঁচে ফেরার অবিশ্বাস্য গল্প
খারকিভ, ইউক্রেন | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
দুই পা হারিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে ছোট্ট গর্তে আট মাসেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে ছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সী সেনাসদস্য কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। চারদিকে শত্রুপক্ষের ড্রোনের নজরদারি, উদ্ধার অভিযানে প্রাণহানির আশঙ্কা এবং গুরুতর শারীরিক আঘাত—সব মিলিয়ে একসময় বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে গত ৪ অক্টোবর একটি ভারী মালবাহী ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে আকাশপথে উদ্ধার করা হয়। প্রায় ৭০ মিটার উচ্চতায় ঝুলিয়ে ড্রোনটি তাঁকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তারা এই অভিযানকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ড্রোনের সাহায্যে একজন সেনাকে আকাশপথে উদ্ধারের প্রথম ঘটনা বলে দাবি করেছেন। তবে এই দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনো চূড়ান্ত তথ্য দেওয়া হয়নি।
সম্মুখসারিতে ৪৯১ দিন
ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের একটি সম্মুখসারির অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামের আরেক সেনাসদস্য। ছোট একটি মাটির বাংকারে অবস্থানকালে নিয়মিত ড্রোনের মাধ্যমে তাঁদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো।
তবে ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার একাধিক প্রচেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে প্রতিস্থাপন করতে যাওয়া দুই সেনা নিহত হন। তাঁদের মরদেহ উদ্ধারে গিয়ে প্রাণ হারান আরও দুই সেনাসদস্য। ফলে এলাকাটি থেকে জীবিত বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। বাধ্য হয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে।
ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত, নিজেই কেটে ফেলেন আরেক পা
স্কুল ভবন থেকে শুকনো কাপড় ও খাবার সংগ্রহ করতে বাইরে বের হলে রুশ নজরদারি ড্রোন তাঁদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোন হামলায় বাসকি নিহত হন। ঘটনাটি ঘটে তাঁর ৫০তম জন্মদিনে।
একই হামলায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পড়ে গিয়ে ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন।
পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানের অবনতি ঘটতে থাকে এবং ডান পায়ের নিচের অংশের হাড় বেরিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ছুরি দিয়ে ডান পায়ের পাতাটিও কেটে ফেলেন তিনি। রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করেন টুর্নিকেট।
রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর সামনে আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। গুরুতর আহত অবস্থায় খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার ওপর নির্ভর করেই তাঁকে টিকে থাকতে হয়েছিল।

‘কিল জোনে’ আট মাসেরও বেশি সময়
যে এলাকায় ভ্লাসেনকো আটকে ছিলেন, সেটি ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছে ‘কিল জোন’ নামে পরিচিত। আকাশে নিয়মিত নজরদারি ও আক্রমণকারী ড্রোন থাকায় সেখানে পিকআপ বা সাঁজোয়া যান দিয়ে আহত সেনাকে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তাঁকে উদ্ধারের জন্য ইউক্রেনীয় বাহিনী মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যান পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর আগেই দুটি যান রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।
উদ্ধার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ সাংকেতিক নামের এক কর্মকর্তা জানান, একপর্যায়ে তাঁরা ভ্লাসেনকোকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন।
এমন সময় তাঁদের নজরে আসে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি ভারী মালবাহী ড্রোন। ছয়টি উল্লম্ব রোটরযুক্ত এই ড্রোনটি সর্বোচ্চ প্রায় ৯০ কেজি ওজন বহন করে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭০ মিটার উচ্চতায় ঝুলিয়ে উদ্ধার
অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের সঙ্গে একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন পাঠানো হয়। এতে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
৪ অক্টোবর উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হারনেসে নিজেকে আটকে নেন। এরপর বিশাল ড্রোনটি তাঁকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট ওপরে তুলে নেয়।
মূল ড্রোনটির নিরাপত্তায় আরও তিনটি ছোট ছয় প্রপেলারের ড্রোন ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ইউক্রেনীয় এফপিভি ড্রোন দল, কামান ও বড় স্থির-পাখার ড্রোনের সাহায্যে রুশ ড্রোনের পরিচিত অবস্থানগুলোতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল উদ্ধারকারী ড্রোনটির ওপর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা।
সব ঝুঁকি পেরিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছায়। নিরাপত্তার স্বার্থে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী উদ্ধারস্থলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি।
মৃত্যুর অপেক্ষা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে
উদ্ধারের পর ভ্লাসেনকোকে উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভ শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল।
তিনি বলেন, একসময় নিজেকে মৃত ভেবে নিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।
তবে ড্রোনে ঝুলে আকাশপথে যাওয়ার সময়ও ভয় তাঁকে ছাড়েনি। বিশেষ করে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাঁকে আতঙ্কিত করেছিল। ভ্লাসেনকো জানান, তিনি সাঁতার জানেন না বলেই পানিতে পড়ে যাওয়াকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিলেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর দেওয়া বিবরণ উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ও ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তাঁর বর্ণনার প্রতিটি বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আকাশপথে ড্রোনের ব্যবহার মূলত নজরদারি, হামলা ও সরবরাহ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভ্লাসেনকোর উদ্ধার অভিযান দেখিয়েছে, প্রচলিত যানবাহনে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব এমন যুদ্ধক্ষেত্রেও ভারী মালবাহী ড্রোন আহত সেনাদের উদ্ধারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযান ঝুঁকিমুক্ত নয়; ড্রোনের বহনক্ষমতা, আবহাওয়া, শত্রুপক্ষের আক্রমণ এবং আহত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা—সবকিছুই এর সাফল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: Reuters





