নির্মম ভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫বছর আগে।তবে চমৎকার শাসনব্যবস্থায় এখনো লিবিয়ার মানুষের স্মৃতিতে ভাসছেন লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি
ত্রিপোলি, লিবিয়া | ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশটির রাজনীতি ও জনপরিসরে তাঁর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিভাজন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, দুর্নীতি এবং দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেশটির মানুষের একটি অংশের মধ্যে গাদ্দাফির শাসনামল নিয়ে স্মৃতিকাতরতা বাড়ছে। তবে এই নস্টালজিয়াকে তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; অনেকের কাছে এটি অতীতের তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবন ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর-এ ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক মুস্তাফা ফেতুরি। নিবন্ধটিতে গাদ্দাফির উত্তরাধিকার, তাঁর ছেলে সাইফ আল-ইসলামের হত্যাকাণ্ড এবং ২০১১ সালের পর লিবিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর: অমীমাংসিত এক অধ্যায়
২০১১ সালের ২০ অক্টোবর লিবিয়ার সির্তে শহরে নিহত হন গাদ্দাফি। তাঁর মৃত্যুর পর দ্রুত গোপন স্থানে দাফন করা হয় তাঁকে। সেই কবরের অবস্থান এখনো প্রকাশ্যে আসেনি বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর তাঁর সমর্থকেরা মৃত্যুর ১৫তম বার্ষিকী পালন করেন।
গাদ্দাফির সমর্থকদের কাছে তাঁর গোপন কবর শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অমীমাংসিত ইতিহাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁদের অনেকে মনে করেন, ২০১১ সালে গাদ্দাফির পতনের সঙ্গে সঙ্গে লিবিয়ার পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। এরপর একটি স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
তবে গাদ্দাফির দীর্ঘ শাসনামল ছিল কঠোর কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্যও পরিচিত। তাঁর আমলে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত ছিল বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করেছে। ফলে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে লিবিয়ার সমাজে মতভেদ এখনো রয়েছে।
সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুতে নতুন করে প্রশ্ন
গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম আল-গাদ্দাফির মৃত্যুও দেশটির রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটর-এর নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিহত হন তিনি। তাঁর জানাজায় লিবিয়ার বানিওয়ালিদ শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি এবং সাবেক শাসনামলের সবুজ পতাকা নিয়ে সমাবেশকে লেখক বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।
সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুতে শুধু গাদ্দাফি পরিবারের একজন সদস্যকে হারানোর ঘটনা নয়, বরং লিবিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ তাঁকে পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে দেখতেন। তবে তাঁর নেতৃত্বে লিবিয়া স্থিতিশীল হতো কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ নেই।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, সাইফের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশটির পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় সন্দেহভাজনদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কথা জানিয়েছিল। কিন্তু লেখাটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত কাউকে আদালতে হাজির করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা অতিরিক্ত তথ্য পাওয়া না গেলে বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্থিতিশীলতার স্মৃতি বনাম কর্তৃত্ববাদী শাসন
গাদ্দাফির শাসনামল নিয়ে স্মৃতিকাতরতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো। নিবন্ধটির ভাষ্য অনুযায়ী, লিবিয়ার নিম্ন আয়ের কিছু পরিবার রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয় ও সুবিধা পেত। তেল ও টেলিযোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে রাষ্ট্রের আয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ভূমিকা রাখত।
২০১১ সালের পর রাজনৈতিক সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার কারণে অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে গাদ্দাফি আমলের কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা নিয়ে স্মৃতিকাতরতা তৈরি হয়েছে।
তবে অতীতের স্থিতিশীলতার স্মৃতি দিয়ে সেই সময়ের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করা যায় না। একইভাবে, গাদ্দাফির পতনের পরের অস্থিরতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর শাসনব্যবস্থার বৈধতা প্রমাণ করে না। লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে উভয় বাস্তবতাই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
দুর্নীতি ও দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান
লিবিয়ার সংকটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি ও জবাবদিহির ঘাটতি। মিডল ইস্ট মনিটর-এর নিবন্ধে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচকের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে লিবিয়ার অবস্থান ছিল ১৭৭তম।
২০১১ সালের অভ্যুত্থানে গাদ্দাফির দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিলিশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। এর ফলে নির্বাচন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
গাদ্দাফির আমলে পশ্চিমা ব্যাংকে বিপুল অর্থ গোপনে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধে লেখক দাবি করেছেন, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানেও গাদ্দাফির ব্যক্তিগতভাবে বিলিয়ন ডলার গোপন পশ্চিমা ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই বক্তব্যটি লেখকের দাবি; এর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান ও আর্থিক নথির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
বিদেশি প্রভাব ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
লিবিয়ার সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; দেশটির ওপর বিদেশি শক্তির প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। ২০১৯ সালে তুরস্ক ও লিবিয়ার তৎকালীন জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামুদ্রিক সীমানা-সংক্রান্ত চুক্তি হয়। সে সময় খলিফা হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলি দখলের জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। তুরস্কের সামরিক সহায়তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে টিকে থাকতে সহায়তা করে।
চুক্তিগুলো নিয়ে লিবিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে বিতর্ক ছিল। সমালোচকেরা এগুলোকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেন; অন্যদিকে সমর্থকেরা নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামুদ্রিক স্বার্থের যুক্তি তুলে ধরেন।
মিডল ইস্ট মনিটর-এর ২২ অক্টোবরের নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর লিবিয়ার পার্লামেন্ট তুরস্কের সঙ্গে সামুদ্রিক চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। এ সিদ্ধান্তকে লেখক অতীতের বিরোধিতার সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে চুক্তির অনুমোদন, এর আইনি পরিধি এবং বাস্তবায়নের অবস্থা মূল্যায়নে পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিচার ও জাতীয় পুনর্মিলনই বড় পরীক্ষা
গাদ্দাফি ও তাঁর ছেলে সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুকে ঘিরে অমীমাংসিত প্রশ্ন লিবিয়ার বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করাই যথেষ্ট নয়; নিরপেক্ষ তদন্ত, সন্দেহভাজনদের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা এবং আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
লিবিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, আইনের শাসন, সব পক্ষের জন্য সমান বিচার এবং জাতীয় পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তেলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় কীভাবে স্বচ্ছভাবে ব্যবহৃত হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত হবে, সেসব প্রশ্নেরও সমাধান দরকার।
গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর পরও তাঁর নাম লিবিয়ার রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একাংশের কাছে তিনি অতীতের স্থিতিশীলতার প্রতীক, অন্যদের কাছে তাঁর শাসন কর্তৃত্ববাদ ও রাজনৈতিক দমনের স্মারক। এই দুই বাস্তবতার বাইরে লিবিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশটি কতটা কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে, রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করতে পারে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করতে পারে—তার ওপর।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর,





