রীতিমতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সৌদির প্রতিরক্ষা চুক্তি ,কিন্তু হুথিদের মোকাবিলায় সাহায্য চাইলেন ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে
রিয়াদ | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। মাত্র এক মাস আগে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করার পরও হুথি হামলার মুখে রিয়াদের তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তার প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়নি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে হুথি মোকাবিলায় গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য জেরুজালেম পোস্ট।
৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক Mecca Joint Defence Agreement-এ সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ৩১ আগস্ট তিন দেশ এই সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও নেয়।
কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে হুথিদের হামলা বাড়ার পর চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, সৌদির ওপর হুথি হামলার পর চুক্তির আওতায় কোনও তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি। ইসলামাবাদ একই সঙ্গে চুক্তির প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
হুথিদের অগ্রযাত্রায় চাপ বাড়ছে রিয়াদের ওপর
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ১১ সেপ্টেম্বর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখলের খবর আসে। এর আগে তারা মোচা বন্দরও নিয়ন্ত্রণে নেয়। পেরিম দ্বীপ বাব এল-মান্দেব প্রণালীর মাঝামাঝি অবস্থান করায় এর নিয়ন্ত্রণ লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের অগ্রযাত্রা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর অবস্থান দুর্বল করেছে এবং বাব এল-মান্দেব ঘিরে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও শহরগুলোকেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য করা হয়েছে।
১৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রিয়াদসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য আকাশ হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ পরে সতর্কতা প্রত্যাহার করলেও রিয়াদের কাছে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

পাকিস্তান-তুরস্কের চুক্তি, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধ নয়
মক্কা চুক্তিকে অনেকে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলেও এর বাস্তব প্রয়োগের কাঠামো এখনও গড়ে উঠছে। চুক্তির মূল লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হলেও কোনও সদস্য আক্রান্ত হলেই অপর দুই দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরাসরি যুদ্ধে নামবে—এমন বিস্তারিত সামরিক প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ৯ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। তবে পরদিন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তখন পর্যন্ত চুক্তির আওতায় কোনও তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি।
অন্যদিকে তুরস্কও সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে তুরস্কের অংশগ্রহণের কোনও প্রকাশ্য ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তিটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি এর বাস্তব সামরিক প্রয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতার আলোচনা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি নতুন মাত্রা সামনে এসেছে। দ্য জেরুজালেম পোস্ট ১৫ সেপ্টেম্বর জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মধ্যস্থতায় সৌদি ও ইসরায়েল হুথিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় নিয়ে আলোচনা করেছে। আঞ্চলিক একজন কূটনীতিকের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, রিয়াদকে হুথি হামলা মোকাবিলায় গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এই খবরের তাৎপর্য রয়েছে, কারণ সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে সরাসরি সামরিক জোটের পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণে সীমিত সহযোগিতার সম্ভাবনাই বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
তবে সৌদি আরব ও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণা করেনি। ফলে এই সহযোগিতাকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বাব এল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি আরবের জন্য বাব এল-মান্দেব শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালমুখী জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এই প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
সাম্প্রতিক হুথি অগ্রযাত্রার ফলে প্রণালীটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর অস্থিতিশীলতা সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য জ্বালানি রপ্তানির বিকল্প পথের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ফলে বাব এল-মান্দেবকে ঘিরে যে কোনও সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক তেলবাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা বাব এল-মান্দেবের ওপর তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে এবং এর ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা?
হুথি হামলার কারণে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে নীরব নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এর ১৬ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথি হুমকি দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব অবিলম্বে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে রিয়াদের অবস্থান এখনও সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
সৌদি আরব একই সময়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা কাঠামো জোরদার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অর্থাৎ রিয়াদের বর্তমান কৌশলকে একক কোনও দেশের ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে একাধিক নিরাপত্তা অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সামনে বড় প্রশ্ন
হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কতটা দ্রুত বাস্তব সামরিক সহযোগিতায় রূপ নেবে, পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের সহায়তা দেবে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহযোগিতা কতদূর এগোবে—এসব বিষয় এখন পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে।
এদিকে ১৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদে আকাশ হামলার সতর্কতা এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদন রয়েছে; কিন্তু কোনও পূর্ণাঙ্গ সৌদি-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের ঘোষণা হয়নি। একইভাবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর থাকলেও পাকিস্তান ও তুরস্কের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টিও এখনও অনির্ধারিত।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সমীকরণে সৌদি আরব একই সঙ্গে তিনটি স্তরে এগোচ্ছে—পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য সীমিত গোয়েন্দা সহযোগিতা। হুথি বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত এই নতুন সমীকরণগুলোর বাস্তব কার্যকারিতা কতটা, তা স্পষ্ট করতে পারে।





