আগামী ২৩সেপ্টেম্বর আমেরিকা সফর করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং।বিমানবন্দরে গিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে পারেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | যুক্তরাষ্ট্র | The Global Journal
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাতে পারেন বলে জানা গেছে। এটি দীর্ঘদিনের মার্কিন কূটনৈতিক প্রোটোকল থেকে ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার বিকেল ৪টায় ইডিটি অনুযায়ী নির্ধারিত এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শির তিন দিনের উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হবে। সফরের মূল পর্বে ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও শির বৈঠক এবং আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অনেক দেশের রাজধানীতে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে বিমানবন্দরের রানওয়েতে স্বাগত জানানো নিয়মিত কূটনৈতিক রীতি হলেও যুক্তরাষ্ট্রে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগতভাবে বিমানবন্দরে গিয়ে বিদেশি নেতাকে স্বাগত জানানো অত্যন্ত বিরল এবং সাধারণত বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সঙ্গেই যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত প্রোটোকল কী?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রচলিত প্রোটোকল অনুযায়ী, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে অবতরণ করলে সাধারণত তাদের স্বাগত জানান মার্কিন চিফ অব প্রোটোকল, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূত অথবা কখনো কোনো মন্ত্রিসভা সদস্য কিংবা ভাইস প্রেসিডেন্ট।
পূর্ণ সামরিক সম্মানসহ আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা—যার মধ্যে ২১ বার তোপধ্বনি, কালার গার্ড এবং দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন অন্তর্ভুক্ত—সাধারণত হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে অনুষ্ঠিত হয়।
এএফপিকে দেওয়া এক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নিজে শির বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সময়ের অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম ট্রাম্প কোনো বিদেশি নেতাকে বিমানবন্দরে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাতে যাচ্ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
শির রাষ্ট্রীয় সফরের সম্ভাব্য সূচি
- বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর: জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে অবতরণ। সেখানে সামরিক সম্মানরক্ষী দলের উপস্থিতিতে ট্রাম্প শিকে স্বাগত জানাবেন।
- বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর: ওভাল অফিস ও ক্যাবিনেট রুমে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যনীতি, তাইওয়ান প্রণালির নিরাপত্তা এবং জ্বালানি করিডোর গুরুত্ব পেতে পারে।
- বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা, ২৪ সেপ্টেম্বর: হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের আয়োজিত এটি দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; এর আগে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলার সফর উপলক্ষে এমন নৈশভোজ আয়োজন করা হয়েছিল।
- শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর: উচ্চপর্যায়ের কার্যকরী বৈঠক শেষে শির বিদায় নেওয়ার কথা রয়েছে।
বিমানবন্দরে স্বাগত জানানো এত বিরল কেন?
আধুনিক মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে কোনো বিদেশি নেতা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর জন্য একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউস ছেড়ে রানওয়েতে অপেক্ষা করার ঘটনা প্রায় দেখা যায় না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক প্রোটোকলে সাধারণত বিদেশি নেতারা হোয়াইট হাউসে আসেন। তাই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট নিজে বিমানবন্দরে গিয়ে কাউকে স্বাগত জানালে সেটিকে বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হয়।
২০০৮ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও বিমানবন্দরের রানওয়েতে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
এই দুই ঘটনাতেই অভ্যর্থনাটি মূলত ধর্মীয় মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক সম্মানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, সরাসরি ভূরাজনৈতিক দর-কষাকষির সঙ্গে নয়। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য বা যুদ্ধকালীন মিত্রদের মতো ঐতিহাসিক মিত্রদের ক্ষেত্রেও অতীতে ব্যতিক্রমী অভ্যর্থনার নজির রয়েছে।
চীনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নেতার ক্ষেত্রে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমানবন্দরে ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে কূটনৈতিক ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন।

চীনে ট্রাম্পও কি একই ধরনের অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন?
চীনা কূটনীতিতে আনুষ্ঠানিক প্রোটোকলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কূটনৈতিক মর্যাদা, আনুষ্ঠানিক সম্মান এবং ‘মিয়ানজি’ বা মর্যাদা রক্ষার ধারণা দেশটির রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্ড্রুজে শির জন্য পরিকল্পিত অভ্যর্থনাটি চলতি বছরের শুরুতে চীন সফরের সময় ট্রাম্প যে অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন, তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
১৩ থেকে ১৫ মে ট্রাম্প বেইজিং সফর করেন। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এটিই ছিল তার প্রথম চীন সফর। এয়ার ফোর্স ওয়ান বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর চীনা নেতৃত্ব ট্রাম্পের জন্য বিশেষ অভ্যর্থনার আয়োজন করে।
চীন ট্রাম্পকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংকে পাঠায়। তার সঙ্গে ছিলেন দেশটির শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূতরা। ২০১৭ সালের ট্রাম্প সফরের তুলনায় এটিকে উল্লেখযোগ্য প্রোটোকলগত পরিবর্তন হিসেবে প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে।
অভ্যর্থনায় সামরিক ব্যান্ড, সশস্ত্র বাহিনীর সম্মানরক্ষী দল, লালগালিচা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা হাতে শত শত তরুণ-তরুণীর উপস্থিতি ছিল।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের সঙ্গে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াংসহ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও ছিল। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
চীনা কূটনীতিতে দুই দেশের নেতার মধ্যে আনুষ্ঠানিক মর্যাদার ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারাও মনে করেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে শিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমমর্যাদার নেতা হিসেবে দৃশ্যমান করাটা বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্ড্রুজে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উপস্থিতি তাই একদিকে বেইজিংয়ের দেওয়া অভ্যর্থনার প্রতিদান হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসে কঠিন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক আলোচনার আগে সম্পর্কের পরিবেশ ইতিবাচক করার একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও আসন্ন বৈঠকের মূল বিষয়গুলো আরও বিস্তৃত। আঞ্চলিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং ওয়াশিংটনের নতুন আইন প্রণয়নের মতো বিভিন্ন ইস্যুর মধ্যে ট্রাম্প ও শির বৈঠক হতে যাচ্ছে।
শির সফরের কয়েক দিন আগে মার্কিন কংগ্রেস Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026 পাস করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনটি ট্রাম্পকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে বিবেচনাধীনের ক্ষমতা দিতে পারে। এই তালিকায় চীন ও ভারত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, বেইজিং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এর বিরোধিতা করে।
বেইজিংয়ের অবস্থান হলো, তৃতীয় কোনো দেশের চাপ বা শুল্কের হুমকির মাধ্যমে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পারস্য উপসাগরে সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে চীন সংলাপ জোরদার এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সহযোগিতার কথা জানিয়েছে।
ওয়াশিংটন চাইছে, ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে চীনের বড় অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তেহরানকে সামুদ্রিক যোগাযোগপথ খুলে দেওয়া এবং সামরিক উত্তেজনা কমানোর দিকে উৎসাহিত করা হোক।
এছাড়া উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। বেইজিং এসব নিষেধাজ্ঞাকে তার উচ্চপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে। ওয়াশিংটনের যুক্তি, অত্যাধুনিক এআই চিপের সামরিক ও বেসামরিক—দুই ধরনের ব্যবহার রয়েছে।
তাইওয়ান ইস্যুও থাকবে আলোচনায়
তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনাও ট্রাম্প-শি বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে শি জিনপিং ওয়াশিংটনকে বারবার সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেছেন, তাইপেই ও ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা সম্পর্ক ‘অটুট’। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি ওভাল অফিসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকে কী কী বিষয় সামনে আসতে পারে?
দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সরাসরি সম্পৃক্ততা থেকে বোঝা যায়, দুই পক্ষই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে যেতে দিতে চায় না—এমনটাই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য লক্ষ্য
- পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানি পরিবহনপথ স্থিতিশীল করতে চীনের সহযোগিতা বা সমর্থন নিশ্চিত করা।
- শিল্পের অতিরিক্ত উৎপাদন ও রপ্তানির বিষয়ে দীর্ঘদিনের মার্কিন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করা।
- অবৈধ সিনথেটিক ওপিওয়েড, বিশেষ করে ফেন্টানিল তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের রপ্তানি বন্ধে চীনা উৎপাদকদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া।
- দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালিতে দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ ও হটলাইন আরও শক্তিশালী করা।
বেইজিংয়ের সম্ভাব্য লক্ষ্য
- রাশিয়া ও ইরানের জ্বালানি আমদানির কারণে সম্ভাব্য ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মার্কিন শুল্কের ঝুঁকি মোকাবিলা করা।
- এআই হার্ডওয়্যার ও উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির ওপর মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা নির্দিষ্ট ছাড় আদায় করা।
- যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ান চায়না’ নীতির প্রতি আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা এবং তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করার চেষ্টা করা।
- মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে শির উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক মর্যাদা পাওয়ার দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র অর্থনৈতিক উত্তেজনার সময় ট্রাম্প ও শির ব্যক্তিগত সম্পর্ক অতীতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সামাল দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শিকে স্বাগত জানাতে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উপস্থিতি তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা নয়; বরং আসন্ন উচ্চপর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-চীন আলোচনার কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংগৃহীত তথ্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে
ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে ওয়াশিংটনে পৌঁছাবেন। তার আগমন উপলক্ষে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে চীনা প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য অত্যন্ত বিরল কূটনৈতিক অভ্যর্থনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা এএফপিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শির বিমান স্থানীয় সময় ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে অবতরণের কথা রয়েছে। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও শির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এটি হবে চলতি বছরে দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক এবং এক দশকেরও বেশি সময় পর কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম হোয়াইট হাউস সফর।
বিমানবন্দরে ট্রাম্পের অভ্যর্থনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের বিমানবন্দরে সাধারণত মার্কিন চিফ অব প্রোটোকল, সামরিক কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূত বা প্রশাসনের অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্বাগত জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাধারণত বিমানবন্দরে গিয়ে বিদেশি নেতাকে স্বাগত জানান না।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শির আগমন অনুষ্ঠানে নিজে উপস্থিত থাকবেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টও জানিয়েছে, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ট্রাম্পের প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে বিমানবন্দরে ব্যক্তিগতভাবে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা হবে।
তবে এই অভ্যর্থনাকে সরাসরি চীনে ট্রাম্প যে ধরনের অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তার পূর্ণ প্রতিরূপ বলা হচ্ছে না। চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্প বেইজিং সফরে গেলে শি নিজে বিমানবন্দরের রানওয়েতে তাকে স্বাগত জানাননি; বরং চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরদিন গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শিকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-শি বৈঠক
২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও শির বৈঠকে বাণিজ্য, শুল্ক, তাইওয়ান, ইরান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং ফেন্টানিল তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের সরবরাহসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানো এবং চলমান ট্যারিফ-সমঝোতা অব্যাহত রাখা আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে চীন থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মাটির উপাদান রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞাও আলোচনায় থাকতে পারে।
২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে শির সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে বড় দর-কষাকষি
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক এখনো বড় ধরনের আলোচনার বিষয়। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ট্যারিফ-সমঝোতার মেয়াদ নভেম্বরের শুরুতে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিং সেই সমঝোতা আরও বাড়ানো বা নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে মার্কিন পণ্য কেনা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানি সহজ করা এবং শিল্প খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ মোকাবিলায় পদক্ষেপ চাইতে পারে। অন্যদিকে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞা ও চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়টি সামনে আনতে পারে।
এআই ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুই নেতার আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। ট্রাম্প এর আগে শির সঙ্গে বৈঠকে এআই নিয়ে আলোচনা করার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন।
উন্নত এআই চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে বেইজিং তার প্রযুক্তি খাতের ওপর চাপ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি কমাতে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো সুরক্ষা কাঠামো এবং দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে দুই সরকার এখনো এসব সুপারিশ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি।
তাইওয়ান ইস্যুতে থাকবে কৌশলগত টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। তাইওয়ানের জন্য মার্কিন অস্ত্র বিক্রি এবং তাইওয়ান প্রণালিতে চীনের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে।
শির সফরের আগে তাইওয়ান যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে, যেখানে প্রথমবারের মতো আক্রমণাত্মক ড্রোন ও প্রচলিত অস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার প্রদর্শন করা হয়েছে।
ফলে শি ও ট্রাম্পের বৈঠকে তাইওয়ান প্রণালির স্থিতিশীলতা, অস্ত্র বিক্রি এবং সামরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও আলোচনায়
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকের সময় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও আলোচনায় আসতে পারে। ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা নীতি দুই দেশের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ট্রাম্প-শি আলোচনার সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবও উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওয়াং সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর জোর দেন। একই আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ও উঠে আসে।
শির সঙ্গে আসতে পারেন বড় চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা
শির যুক্তরাষ্ট্র সফরে বড় চীনা কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের একটি প্রতিনিধিদলও যুক্ত হতে পারে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সম্ভাব্য প্রতিনিধিদের মধ্যে BYD, CATL, Xiaomi, Gotion, Hisense, Wanxiang Group, Bank of China এবং COFCO Group-এর কর্মকর্তাদের নাম এসেছে।
তবে প্রতিনিধিদলের চূড়ান্ত তালিকা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
কূটনৈতিক বার্তা দেবে বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা
জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বিমানবন্দর অভ্যর্থনা সাধারণ কূটনৈতিক রীতির বাইরে।
তবে এই অভ্যর্থনার মাধ্যমে দুই দেশের মতপার্থক্য দূর হয়ে যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, ইরান ও নিরাপত্তাসহ একাধিক জটিল ইস্যুতে ট্রাম্প ও শির বৈঠকে কঠিন দর-কষাকষি হওয়ার সম্ভাবনাই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর অ্যান্ড্রুজে শিকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাওয়া সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হবে ২৪ সেপ্টেম্বরের হোয়াইট হাউস বৈঠক। দুই নেতার আলোচনার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এজেন্সির তথ্যসহ





