এবারের কিরগিজস্তান SCO সম্মেলন কেন ভারতীয় কূটনীতি ও BRICS জোটের জন্য আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
— গ্লোবাল জার্নাল | বিশকেক | ৩১ আগস্ট
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে শুরু হয়েছে ২৫তম শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফসহ সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
এবারের সম্মেলন ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় BRICS সম্মেলনের প্রস্তুতি, মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, ভারত-চীন যোগাযোগ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান—এসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
২৫ বছরে SCO
SCO-এর ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে ‘Shanghai Five’ উদ্যোগের মাধ্যমে। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ২০০১ সালে উজবেকিস্তান যোগ দেওয়ার পর সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে SCO হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান, ২০২৩ সালে ইরান এবং ২০২৪ সালে বেলারুশ পূর্ণ সদস্য হওয়ার পর বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা ১০টি।
সদস্য দেশগুলো হলো—চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও বেলারুশ।
SCO কোনো সামরিক জোট নয়। ন্যাটোর মতো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর পরিবর্তে এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতার একটি বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম।
নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
বিশকেক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কও SCO-এর আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় SCO-এর Regional Anti-Terrorist Structure (RATS)-এর কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
BRICS সম্মেলনের আগে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ
ভারতের জন্য এবারের SCO সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় BRICS সম্মেলনের আগে সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয়ের সুযোগ।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বৈঠকও বিশেষ নজরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
BRICS-এর সম্ভাব্য যৌথ অবস্থান ও ঘোষণাপত্র নিয়েও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য কমাতে ভারত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের হিসাব
২০২৭ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আসনে ভারত ও তাজিকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও SCO সম্মেলনকে ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশকেকে তাজিকিস্তানের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করার সুযোগ রয়েছে। অতীতেও ভারত আঞ্চলিক কূটনীতির মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনে সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সুযোগ
বিশকেক সম্মেলনের মাধ্যমে ভারত মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ পাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা ভারত-মধ্য এশিয়া সম্মেলনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মোদি-শি বৈঠকেও নজর
ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এবারের SCO সম্মেলন তাৎপর্যপূর্ণ। সীমান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর বহুপক্ষীয় এই প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যও SCO সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখা এবং চীন, ভারত ও অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা মস্কোর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
ভারতের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব
সব মিলিয়ে, এবারের SCO সম্মেলন ভারতের জন্য শুধু একটি বহুপক্ষীয় বৈঠক নয়। এটি মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বাড়ানো, BRICS সম্মেলনের ভিত্তি প্রস্তুত করা, ভারত-চীন সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে অবস্থান সমন্বয় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
বিশকেকের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলাফল আগামী কয়েক মাসে ভারতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

— গ্লোবাল জার্নাল | বিশকেক | ৩১ আগস্ট





