শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনার উদ্দেশ্যে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনেস্কি যদি কল দেয় তার সঙ্গে কথা বলবে -প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
মস্কো, রাশিয়া | ২ নভেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ফোন করলে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই মস্কোর পক্ষ থেকে এমন বার্তা এসেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বলেন, জেলেনস্কি ফোন করলে পুতিন অবশ্যই তা গ্রহণ করবেন। তাঁর ভাষায়, পুতিন কখনোই আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানাননি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চলতি মাসের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে শান্তি আলোচনা আবারও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেই আলোচনার আগে পুতিনের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যকে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাব্য নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২২ সালের পর পুতিন-জেলেনস্কির সরাসরি যোগাযোগ নেই
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে সরাসরি কিংবা টেলিফোনে কোনো কথা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ‘নরম্যান্ডি ফরম্যাট’ বৈঠকে দুই নেতা সর্বশেষ সরাসরি সাক্ষাৎ করেছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরেই পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের দাবি জানিয়ে আসছে কিয়েভ। গত জুলাইয়ে জেলেনস্কি পুতিনকে একটি খোলা চিঠি লিখে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে ইউক্রেনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে শুক্রবার দ্য কিয়েভ ইনডিপেনডেন্ট জানায়, সরাসরি বৈঠকের পরিবর্তে ফোনে কথা বলার প্রস্তাব দিয়ে পুতিনের পক্ষ থেকে বৈঠক এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ওই কর্মকর্তা বলেন, এর আগেও ফোনালাপের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে।

আলোচনায় প্রস্তুত মস্কো, তবে সরাসরি বৈঠক নিয়ে শর্ত রয়েছে
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার বলেছেন, পুতিন সবার সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। জেলেনস্কির সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পেসকভ বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ ফোন করেনি।
এর আগে পুতিন জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ‘অবৈধ নেতা’ বলে অভিহিত করেন। পুতিনের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে থেকে অনুমোদিত কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয় থাকলেই কেবল জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসার সুযোগ রয়েছে।
পেসকভ আরও বলেছেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন—এই তিন পক্ষের অংশগ্রহণে শান্তি আলোচনার প্রথম কয়েকটি পর্ব অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। আলোচনায় ইউরোপীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মস্কোর কার্যকর যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা তিন পক্ষের মধ্যেই হওয়া যৌক্তিক।
শান্তি আলোচনায় ইউরোপের অংশগ্রহণ নিয়ে ভিন্ন বার্তা
অন্যদিকে, ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বলেছেন, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান আলোচনায় ইউরোপকেও যুক্ত করা উচিত। তাঁর মতে, কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইউরোপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে দ্য টেলিগ্রাফ-এর কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় ত্রিপক্ষীয় আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত বিষয়ে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে পারে মস্কো। ন্যাটোর সম্প্রসারণকে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।
রাশিয়া নিয়ে বক্তব্য সংযত করার আহ্বান পেন্টাগনের
এদিকে, রাশিয়ার হুমকি নিয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যের ভাষা কিছুটা সংযত করার জন্য ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশকে পেন্টাগন পরামর্শ দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিশেষ করে লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য কমিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রয়টার্সের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ন্যাটোর নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে যে রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া অতিরিক্ত কঠোর বিবৃতি নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কোলবিসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ বার্তা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সরকারও একই ধরনের বার্তা পেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় নেতাদের কিছু বক্তব্যকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠোর বলে উল্লেখ করেছেন কোলবি। উদাহরণ হিসেবে তিনি রুশ প্রেসিডেন্টকে ‘ইঁদুরের মতো কোণঠাসা’ করার মন্তব্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্য উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরে এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিশাল পুতিনকে ‘ইঁদুরের মতো কোণঠাসা’ করার মন্তব্য করেছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ক্রমেই চাপে পড়ছেন—এমন ধারণা বোঝাতেই তিনি ওই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিদলকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে ইউরোপের এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা সহযোগিতা করছে, তবে অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য ও প্রকাশ্য উত্তেজনা এড়িয়ে চলা উচিত। অন্যদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পেন্টাগন। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, মিত্রদেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে হওয়া আলোচনা গোপনীয়; তাই এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবে না।
শান্তি উদ্যোগের সামনে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সব মিলিয়ে, আবুধাবিতে সম্ভাব্য নতুন শান্তি আলোচনা শুরুর আগে পুতিনের ফোনালাপে সম্মতির বার্তা এবং আলোচনায় ইউরোপের ভূমিকা নিয়ে মস্কোর ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে আলোচনার শর্ত, ইউক্রেনের অবস্থান, রাশিয়ার দাবিদাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য কিয়েভ ইনডিপেনডেন্ট ও রয়টার্স









