Breaking
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা,ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফর—কোন সমীকরণে ভূরাজনৈতিক ‘ট্রাম কার্ড’ বাংলাদেশ ?

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা,ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফর—কোন সমীকরণে ভূরাজনৈতিক ‘ট্রাম কার্ড’ বাংলাদেশ ?

Share:

Written By

News Desk

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা,ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফর—কোন সমীকরণে ভূরাজনৈতিক ‘ট্রাম কার্ড’ বাংলাদেশের ?

নয়াদিল্লি ও ঢাকা | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত দোভালের কথিত গোপন ঢাকা সফর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর—সব মিলিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর অজিত দোভাল গোপনে ঢাকা সফর করেন। তবে সফরের প্রায় ১০ দিন পরও বাংলাদেশ ও ভারতের কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে এ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময় হিসেবে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। তবে সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।

দুই দেশের এই কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারত ঠিক কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে?

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিলতা

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম জটিল ইস্যু হয়ে রয়েছে।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণার বিষয়টি এই প্রেক্ষাপটে নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য সময়, আইনি প্রক্রিয়া এবং ভারত সরকারের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া এ ঘোষণার কূটনৈতিক প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে রয়েছে। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, এ বিষয়ে অমীমাংসিত পরিস্থিতি তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময়সূচি নির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অজিত দোভালের কথিত ঢাকা সফর: শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি?

১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রেডিফের প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে অজিত দোভাল ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রায় দিনের তিন-চতুর্থাংশ সময় অবস্থান করেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নয়াদিল্লিতে দোভালের সঙ্গে বিস্তারিত বৈঠক করেন।

এসব বৈঠকের বিষয়ে দুই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সম্পৃক্ততা নিরাপত্তা সহযোগিতা, কৌশলগত যোগাযোগ কিংবা সংবেদনশীল দ্বিপক্ষীয় বিষয় আলোচনার সম্ভাবনাও সামনে আনে।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কৌশলগত বিষয় নিয়ে কাজ করেন এবং নিরাপত্তা সংকটের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করতে পারেন।

তবে দোভালের কথিত সফরে ঠিক কোন বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

তারেক রহমানের ভারত সফরে সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি

দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাব্য সময় হিসেবে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ বিবেচনা করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্তপথে মানুষের চলাচল
  • সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সমন্বয়
  • বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক
  • অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন
  • জ্বালানি সহযোগিতা
  • আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত যোগাযোগ

এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে অজিত দোভালের বৈঠকও দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে তারেক রহমানের জন্মদিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পরবর্তী জবাবকে সম্ভাব্য সফরের কূটনৈতিক পরিবেশ উন্নয়নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কয়েকজন ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, বাংলাদেশে নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশের বাইরে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিএনপি সরকারকে সরিয়ে ২০০৭–০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে নতুন প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

এসব প্রতিবেদনে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের কথিত বৈঠকের পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমর্থন ও অর্থায়নের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষও এগুলোকে সত্য বলে নিশ্চিত করেনি। ফলে এসব দাবিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা থাকলে তা ভারত-বাংলাদেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভূমিকা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের একজন কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ইস্যু কীভাবে সামলানো হবে, তা বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে নির্ধারণ করবে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও দলটির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকারের ওপর নির্ভর করবে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন বলে সূত্রটির দাবি।

এ ছাড়া একজন ভারতীয় কূটনৈতিক সাংবাদিকের দাবি, দুটি পশ্চিমা দেশের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক সম্প্রতি নয়াদিল্লি থেকে কলকাতায় গিয়ে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। ঢাকায় নিযুক্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনীতিকেরাও বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা সফর করে পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়ন তৈরির চেষ্টা করেছেন বলে তিনি জানান।

তবে এসব যোগাযোগের বিবরণ সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। কূটনৈতিক যোগাযোগ বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পদক্ষেপে ঐকমত্যের প্রমাণ হিসেবেও দেখা যায় না।

বাংলাদেশের ‘ট্রাম কার্ড’—কূটনৈতিক বাস্তবতা ও সম্ভাব্য সমীকরণ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত গুরুত্ব দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—প্রতিটি বিষয়ই দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে রয়েছে।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং অজিত দোভালের কথিত ঢাকা সফর—এই তিনটি ঘটনাকে একই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষণ করা হলেও এগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো সমঝোতা বা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী পদক্ষেপ

বর্তমানে সবচেয়ে স্পষ্ট কূটনৈতিক অগ্রগতি হলো দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা।

তবে অজিত দোভালের কথিত সফরের আলোচ্যসূচি, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নয়াদিল্লির বৈঠকের বিষয়বস্তু এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার নয়।

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সমীকরণ আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শেখ হাসিনা ইস্যু এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর—তিনটি বিষয়ই বর্তমানে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। তবে দোভালের কথিত সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: রেডিফ, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের বক্তব্য।

      কলামিস্ট -ফজলে রাব্বী রবনা