Breaking
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় চ্যালেঞ্জের মুখে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি পাকিস্তান

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় চ্যালেঞ্জের মুখে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি পাকিস্তান

Share:

Written By

News Desk

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় চ্যালেঞ্জের মুখে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি পাকিস্তান

ইসলামাবাদ, পাকিস্তান | ৪ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল

সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক ধারাবাহিক হামলা পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় বৃহত্তর ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামনে কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত জটিলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গত ৭ আগস্ট মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল পারস্পরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো।

বর্তমানে সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়ায় সেই প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন বিষয়ক জোট গত ১ অক্টোবর দাবি করেছে, ২৯ সেপ্টেম্বর মদিনায় নবীজির মসজিদসংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী তাইবাহ বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রে ড্রোন হামলা হুতিদের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফল। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, হামলায় একটি ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সচল ছিল। তবে হুতিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এর আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতি হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে। আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার এবং সৌদি ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত থাকায় মক্কা চুক্তির অন্যতম মূল উদ্দেশ্য—সম্মিলিত প্রতিরোধ—এখন বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর প্রশ্ন

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি বলেছেন, চুক্তির অধীনে সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তান “যে কোনো উপলব্ধ উপায়ে” সহায়তা করবে। তিনি অবশ্য নিশ্চিত করেননি যে পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যে ইয়েমেনে কোনো বিমান হামলায় অংশ নিয়েছে কি না। একইভাবে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা চেয়েছে কি না, তাও তিনি জানাননি।

পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি দেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে মক্কা চুক্তির বাস্তব সামরিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছিল, চুক্তির অধীনে কীভাবে, কখন, কোথায় এবং কী ধরনের বাহিনী ব্যবহার করা হবে—এসব কার্যকরী বিষয় এখনো নির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

এদিকে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, মক্কা চুক্তির কৌশলগত রাজনৈতিক-প্রতিরক্ষা কমিটির একটি জরুরি বৈঠক আগামী সপ্তাহে রিয়াদে অনুষ্ঠিত হবে। হুতিদের সৌদি আরবের ওপর হামলাই বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে।

পাকিস্তানের সামনে বড় কৌশলগত সীমাবদ্ধতা

সৌদি আরবকে সামরিকভাবে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পাকিস্তানের জন্য সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়। ইসলামাবাদ একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনে আলোচনার পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, দেশটি সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থনের পাশাপাশি বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সংলাপ ও কূটনীতির পথ অব্যাহত রাখবে।

এই অবস্থান পাকিস্তানের জন্য একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার; অন্যদিকে হুতিদের ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হয়। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান পাকিস্তানকে ইরান-সংলগ্ন সংঘাতে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এর সঙ্গে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বিবেচনায় রয়েছে। দেশটি নিজেই সন্ত্রাসবাদ, বেলুচিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা এবং আফগানিস্তান সীমান্তসংক্রান্ত উত্তেজনার মতো একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ফলে নতুন একটি আঞ্চলিক সামরিক ফ্রন্টে সরাসরি প্রবেশের রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তুরস্কও প্রস্তুতির কথা বলেছে

মক্কা চুক্তির তৃতীয় অংশীদার তুরস্কও সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা প্রয়োজন মেটাতে আঙ্কারা প্রস্তুত। তবে চুক্তির বাস্তব সামরিক প্রয়োগ এখনো জটিল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সমন্বয়, নির্দিষ্ট কার্যকরী প্রক্রিয়া ও চুক্তির সক্রিয়করণের কাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এ কারণে সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত থাকলেও মক্কা চুক্তিকে এখনই ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত সামরিক জোট হিসেবে দেখা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, চুক্তিটি নীতিগতভাবে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ভিত্তি তৈরি করলেও এর বাস্তব সক্রিয়করণ এখনও রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জটিল।

চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতার সামনে বড় প্রশ্ন

মক্কা চুক্তির মূল শক্তি হলো—এক সদস্যের ওপর হামলা হলে অন্য সদস্যরা তার পাশে দাঁড়াবে—এই প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সৌদি আরবের ওপর হামলা অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন উঠছে, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে।

পাকিস্তান ও তুরস্ক যদি সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তারা ইয়েমেনের সংঘাতের গভীরে জড়িয়ে পড়তে পারে। আবার সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া না দিলে চুক্তিটির প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তান মনে করছে, সৌদি আরবের পাশে থাকা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। মক্কা চুক্তির কাঠামো এখনও বিকাশমান হওয়ায় রিয়াদের আসন্ন বৈঠকটি এই জোটের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সৌদি-হুতি সংঘাত তাই শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবের নিরাপত্তার বিষয় হয়ে থাকছে না; এটি পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রথম বড় বাস্তব পরীক্ষা হিসেবেও সামনে এসেছে। আগামী দিনে তিন দেশ কী ধরনের যৌথ পদক্ষেপ নেয়, সেটিই মক্কা চুক্তি কার্যকর প্রতিরক্ষা জোটে পরিণত হবে, নাকি মূলত একটি রাজনৈতিক-কৌশলগত প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থাকবে—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।