সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত
রিয়াদ, সৌদি আরব | ১১ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। হামলায় বিমানবন্দরের স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে সাময়িকভাবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
সৌদি জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (GACA) জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ও দুইজন বাংলাদেশি রয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিশরের একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
এক সপ্তাহে তৃতীয় হামলার দাবি
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, চলতি সপ্তাহে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি তৃতীয় হামলা। এর আগে বৃহস্পতিবারের হামলায় অন্তত তিনজন সৌদি নাগরিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে একজন পাইলট ছিলেন বলে GACA জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবারের হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তবে শনিবারের নতুন হামলার পর আবারও কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
হামলার ধারাবাহিকতা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক বিমান চলাচল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট
ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলাটিকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে।
জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী এই হামলার জবাব দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো নিক্ষিপ্ত বস্তু আছড়ে পড়েছে। তবে ওই ঘটনার ফলে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

সৌদি বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত
আল জাজিরার সানা প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিরা কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
শনিবারের হামলার পর হুথিদের গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেন, তাঁদের হামলায় রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
হুথিরা বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর গোষ্ঠীটি সৌদি আকাশসীমাকে সামরিক অভিযান এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
হুথিদের ঘোষণায় বলা হয়েছে, মক্কা ও মদিনার ওপরের আকাশসীমা ছাড়া ওই এলাকায় চলাচলকারী যেকোনো বিমান তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এ ধরনের ঘোষণার ফলে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল ও আঞ্চলিক আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাত থেকে আঞ্চলিক উত্তেজনা
ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী এবং ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার সময়েই সৌদি বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসছে এবং হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এসব অভিযানের মধ্যে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় চালানো হামলাও রয়েছে।
হুথিরা সৌদি বিমানবন্দরে হামলাকে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে বেসামরিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবেইদ আল জাজিরাকে বলেছেন, সৌদি বিমান হামলার পর হুথিদের পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা ছিল। তবে তিনি বিমানবন্দরকে একটি স্পষ্টতই বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
কাতারসহ বিভিন্ন দেশের নিন্দা ও সংহতি
কাতার হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তাদের দৃষ্টিতে এই ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। মিশর, জর্ডান ও ওমানও সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে এবং হতাহতদের ঘটনায় শোক জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলাটিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। হুথিদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়া উচিত কি না, তা তিনি মূল্যায়ন করছেন বলেও জানিয়েছেন।
বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়ায় হামলাটির কূটনৈতিক গুরুত্ব এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিদেশি দূতাবাসগুলোর সতর্কতা
রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও কানাডার দূতাবাস নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশন জানিয়েছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে তারা অবগত এবং মার্কিন নাগরিকদের বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার জোরালো পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের দূতাবাস বিমানবন্দরে একটি গুরুতর ঘটনার বিষয়ে নাগরিকদের সতর্ক করেছে। কানাডার দূতাবাসও চলমান সামরিক তৎপরতার কথা উল্লেখ করে রিয়াদে অবস্থানরত নাগরিকদের বিমানবন্দরে যাতায়াত এড়িয়ে চলতে বলেছে।
এর আগে আবহা ও রিয়াদ বিমানবন্দরেও হামলার খবর
এর আগে ৭ অক্টোবর সৌদি আরব জানিয়েছিল, আবহা ও কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় তিনজন বিদেশি নাগরিক নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় আরও তিনজন নিহত হওয়ার খবর দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ।
শনিবারের হামলায় হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার ঘটনায় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাতের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি, হুথিদের নতুন হামলার ঘোষণা এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোর সতর্কতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
প্রতিবেদনটি সৌদি কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। হতাহতের সংখ্যা, হামলার দায় ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।





