আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন চাপ সহ্য করবো না,সন্মানের উপর ভিত্তি করেই প্রস্তাব গ্রহনযোগ্য হলে আলোচনায় বসার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে -ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তেহরান প্রস্তুত। তবে কোনো ধরনের চাপ, হুমকি কিংবা জবরদস্তির মুখে নতি স্বীকার করবে না ইরান। তাঁর মতে, পারস্পরিক সম্মান ও বিদ্যমান সমঝোতার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব এলে কূটনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরকালে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি ২৫ সেপ্টেম্বর ধারণ করা হয়। এতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আস্থার সংকট, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।
চাপ ও জবরদস্তির মাধ্যমে সমঝোতা সম্ভব নয়
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান আন্তরিকভাবে আলোচনায় আগ্রহী। তবে আলোচনার পাশাপাশি সামরিক হামলা, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখা কঠিন।
তিনি বলেন, “আমরা আলোচনায় বসছি, অথচ একই সময়ে আমাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে—এটা কোন যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য?” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে হলে আগে লিখিত প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতাগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট
ইরানি প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, অতীতের সমঝোতা ভঙ্গের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তেহরানের আস্থায় গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের ইরান পরমাণু চুক্তি—জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)—থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়াকে তিনি অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলাকালে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়া এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার ঘটনাগুলো আস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ আলোচনার আগে দুই পক্ষকে স্পষ্ট করতে হবে, ঠিক কোন বিষয়ে সমঝোতা চাওয়া হচ্ছে এবং স্বাক্ষরিত শর্তগুলো কীভাবে কার্যকর করা হবে।
ইসলামাবাদের সমঝোতার কাঠামো ধরে আলোচনার প্রস্তাব
পেজেশকিয়ান জানান, এর আগে পাকিস্তানে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (MoU) ভিত্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এগিয়েছিল। তাঁর দাবি, সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, আগের সমঝোতার লক্ষ্য ও কাঠামো ধরে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সেই কাঠামো মেনে এগোতে সম্মত হলে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও আলোচনার পথ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শন
সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার বিষয়টিও উঠে আসে। পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমুদ্রপথে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং তেহরানও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষ সম্মত কাঠামো অনুসরণ করলে জাহাজ চলাচল ও পরবর্তী আলোচনা নিয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান পুনর্ব্যক্ত করেন, তাঁর দেশ পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে না। তিনি জানান, আলোচনার অংশ হিসেবে জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের প্রবেশ ও পরিদর্শনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নির্দিষ্ট আলোচনাকাঠামোর মধ্যে নির্ধারণ করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনার পথ খোলা, তবে আস্থা পুনর্গঠন জরুরি
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। তবে তাঁর শর্ত হলো, আলোচনার পরিবেশে চাপ ও সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং লিখিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই বিরোধের সমাধান প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ইরানের ওপর হামলা হলে দেশটি আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থার মধ্যে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে আলোচনার সম্ভাবনা ও দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকট—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে।
তথ্যসূত্র: সিবিএস নিউজ, রয়টার্স।





