পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি ভূমিজুড়ে ইসরায়েলি ইহুদিদের অবৈধ বসতির বিস্তার -বাড়ছে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংস হামলা
পশ্চিম তীর, ফিলিস্তিন | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর ইসরায়েলি বসতির বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও বাড়ছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর OCHA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৮০০ ছাড়ায়—গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচটি হামলা। এসব হামলায় ফিলিস্তিনি হতাহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও অন্যান্য সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে।
২০২৬ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ OCHA পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৩৮০টিরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৯০০ ফিলিস্তিনি আহত এবং ২ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে বাড়ছে বসতির বিস্তার
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলে নেওয়ার পর থেকে এসব এলাকায় ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে পশ্চিম তীরজুড়ে সরকারি অনুমোদিত ইসরায়েলি বসতির পাশাপাশি শত শত আউটপোস্ট গড়ে উঠেছে। ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণবিরোধী সংগঠন পিস নাউ (Peace Now)-এর হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিম তীরে সরকারি প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ১৪৬টি বসতি রয়েছে; পূর্ব জেরুজালেম এই হিসাবের বাইরে।
অন্যদিকে আউটপোস্টগুলো সাধারণত আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠে এবং ইসরায়েলি আইনেও এগুলোর অনেকগুলো অবৈধ হিসেবে বিবেচিত। তবে সময়ের সঙ্গে কিছু আউটপোস্টকে অনুমোদন দেওয়া বা বিদ্যমান বসতির সঙ্গে যুক্ত করার ঘটনা ঘটেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৫ সালের বসতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরে ৫৪টি নতুন সরকারি বসতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনুমোদন করে, যা এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে ৮৬টি নতুন আউটপোস্ট গড়ে ওঠে।

বসতি ও সড়ক নেটওয়ার্কে খণ্ডিত হচ্ছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড
ইসরায়েলি বসতিগুলো শুধু আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠছে না; এসব বসতিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করতে বিস্তৃত সড়ক ও অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয়েছে।
বসতিগুলোর সঙ্গে যুক্ত অনেক সড়ক ও বাইপাস রুট ফিলিস্তিনি জনপদ ও কৃষিজমির মধ্য দিয়ে গেছে। এর ফলে বিভিন্ন ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি চলাচলে চেকপোস্ট ও অন্যান্য বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ছে।
জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত E1 এলাকা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের অন্যান্য অংশের মধ্যকার ভৌগোলিক সংযোগ আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনে বসতি নিয়ে বিরোধ
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালসহ (ICJ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতে ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী দখল, বসতি নীতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।
তবে ইসরায়েল বসতিগুলোকে তার নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক দাবির অংশ হিসেবে দেখে এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনার সঙ্গে একমত নয়।
বসতিস্থাপনকারীদের হামলা রেকর্ড পর্যায়ে
বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতিস্থাপনকারীদের সহিংস হামলাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
OCHA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা ছিল ৮৫২টি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ২৯১টি, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৪৯টি এবং ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ৮২৮টিতে পৌঁছে।
২০২৫ সালে এসব হামলায় ফিলিস্তিনিদের ওপর শারীরিক হামলা, কৃষিজমি ও জলসম্পদের ক্ষতি, বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা ভাঙচুর এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। OCHA জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় আহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ছিল ৮০০-এর বেশি।
২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বছরের প্রথম সাত মাসেই ১ হাজার ৩৮০টির বেশি বসতিস্থাপনকারী-সংশ্লিষ্ট ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে OCHA।

নতুন আউটপোস্ট ও ভূমি দখলের অভিযোগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন আউটপোস্ট স্থাপনকে পশ্চিম তীরে ভূমি দখল ও বসতি সম্প্রসারণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের পর কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি-সমর্থক উদ্যোক্তা পশ্চিম তীরে অন্তত কয়েকটি নতুন আউটপোস্ট গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভূমি দখল, ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাস্তুচ্যুতি এবং বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগও উঠে এসেছে।
এদিকে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় ফাক্কুয়া এলাকায় বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি গ্রামবাসীদের সংঘর্ষের সময় এক ইসরায়েলি সেনার গুলিতে এক ফিলিস্তিনি আহত হন; ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ঘটনাটি তদন্ত করছে।
আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে
ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিয়ে নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি জোটও বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বসতি সম্প্রসারণ, নতুন আউটপোস্ট, সড়ক অবকাঠামো এবং বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা—এই চারটি প্রবণতা একসঙ্গে পশ্চিম তীরের ভূখণ্ডগত বাস্তবতাকে দ্রুত পরিবর্তন করছে।
ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা, স্থানীয় জনগণের চলাচল ও ভবিষ্যৎ দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।





