পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ কে প্রতিহত করতে রাজধানীর প্রাবেশধার জুড়ে প্রশাসনের কনটেইনারের ব্যারিকেড
ইসলামাবাদ, পাকিস্তান | ৩ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) পরিকল্পিত ইসলামাবাদমুখী লংমার্চকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে বিপুলসংখ্যক কনটেইনার দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ইসলামাবাদের স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশটির পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদের বিভিন্ন সড়কে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ভারী কনটেইনার বসানো হয়েছে। প্রায় চার টন ওজনের এসব কনটেইনারের কিছুতে বালু ভরে আরও ভারী করা হয়েছে, যাতে সহজে সরানো না যায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে এই ব্যারিকেড রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেইনারে ঘেরা ইসলামাবাদকে অনেকে ‘কনটেইনারাবাদ’ নামে উল্লেখ করছেন।
এই নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল কারণ পিটিআইয়ের ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ। দলটি প্রথমে ২৭ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিলেও পরে তা পিছিয়ে ৪ অক্টোবর নির্ধারণ করে। ইমরান খানের মুক্তি এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দাবি।
পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কনটেইনার বসানোর সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির তারিখের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়নি। সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেছেন, রাজধানী হিসেবে ইসলামাবাদে নিরাপত্তা প্রস্তুতি অনেক সময় আগেই নেওয়া হয়।

উত্তরমুখী পণ্য পরিবহনে বড় বাধা
রাজধানীর সড়কে কনটেইনার ব্যবহারের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে পরিবহন খাতে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসেই কর্তৃপক্ষ ২ হাজারের বেশি যানবাহন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়; এর অনেকগুলোতে তখন পণ্য ছিল। এতে চালকদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ইসলামাবাদ বা পাঞ্জাবের দিকে গেলে তাদের গাড়ি ও পণ্যও জব্দ হতে পারে। ফলে অনেক ট্রাকচালক উত্তরমুখী যাত্রা এড়িয়ে চলছেন।
ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, জেহলাম, পেশোয়ার ও অ্যাটকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে এর প্রভাব পড়েছে। কোথাও বিকল্প পথ ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কোনো কোনো পরিবহনকারী নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যাত্রা থামিয়ে দিচ্ছেন। এতে পণ্য সরবরাহে বিলম্বের পাশাপাশি ট্রাকচালক ও পরিবহন মালিকদের আর্থিক ক্ষতিও বাড়ছে।
দিনের পর দিন যানবাহন ও কনটেইনার আটকে থাকায় চালকদের আয় কমছে। একই সঙ্গে ট্রাকের রক্ষণাবেক্ষণ, চালকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে পরিবহন মালিকদের। পণ্য সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।
করাচি বন্দরে পণ্যবোঝাই কনটেইনারের চাপ
ইসলামাবাদে কনটেইনার-নির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব রাজধানীর বাইরেও পৌঁছেছে। Reuters জানিয়েছে, ট্রাকচালকদের একটি অংশ উত্তরমুখী যাত্রা বন্ধ রাখায় করাচি বন্দরে পণ্যবোঝাই কনটেইনার জমে যাচ্ছে। এর ফলে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে এবং পরিবহনকারীদের খরচও বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটকে থাকা একটি কনটেইনারের জন্য প্রতিদিন ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত ডেমারেজ দিতে হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পণ্য দেরিতে পৌঁছানোর ক্ষতি এবং ট্রাক অলস পড়ে থাকার ব্যয়।
পাকিস্তানের পরিবহন খাত এমনিতেই ব্যয়ের চাপে রয়েছে। Reuters-এর হিসাবে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির পরিবহন মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ রুটে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিবহন ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর অর্থনীতিতেও প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগবিঘ্নের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু কনটেইনার, ট্রাক বা পরিবহন ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজধানীর ব্যবসা, পর্যটন, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পিটিআইয়ের ৪ অক্টোবরের কর্মসূচিকে সামনে রেখে ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কনটেইনারের ব্যারিকেড এবং বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠেকাতে নেওয়া নিরাপত্তাপদক্ষেপের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন পাকিস্তানে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।





