পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের লং মার্চ, কঠিন রাজনৈতিক চাপে ইসলামাবাদ
ইসলামাবাদ, পাকিস্তান | ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | The Global Journal
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী আন্দোলন ও লং মার্চের প্রস্তুতি নিচ্ছে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। একদিকে রাজপথে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতি, অন্যদিকে সামরিক নেতৃত্বের সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে নতুন করে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে ইসলামাবাদ প্রশাসন।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তার সমর্থকদের অভিযোগ, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখতেই বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, ইমরান খান আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আইন অনুযায়ী সাজা ভোগ করছেন।
ইমরানের দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তাকে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটির কেন্দ্রে রেখেছে। তার সমর্থকদের মতে, কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও দেশটির রাজনীতিতে তার প্রভাব কমেনি।
২৭ সেপ্টেম্বর লং মার্চের প্রস্তুতি
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছে। দলের খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি জানিয়েছেন, তিনি আদিয়ালা কারাগারের দিকে মিছিলের নেতৃত্ব দেবেন।
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ইসলামাবাদে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতীতেও ইমরান সমর্থকদের আন্দোলন ও মিছিলকে কেন্দ্র করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে।
ফলে সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে, নাকি আবারও বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করবে—সেটিই এখন ইসলামাবাদ প্রশাসনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

ইমরান-পন্থী শিবিরে সমঝোতার বার্তা
এর মধ্যেই ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি রয়টার্সকে বলেছেন, ইমরান মুক্তি পেলে প্রভাবশালী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাবেন না।
বুখারির বক্তব্য অনুযায়ী, ইমরান ব্যক্তিগত ক্ষোভ একপাশে রেখে সামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক থাকতে পারেন।
তবে এই বক্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি ইমরান খানের নিজের প্রকাশ্য বক্তব্য নয়; বরং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর দেওয়া একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন। ফলে এটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতার প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ এখনও নেই।
ইরান কূটনীতিতে আসিম মুনিরের বাড়তি গুরুত্ব
অন্যদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে তার ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। ইরান-সংক্রান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের প্রভাব কাজে লাগানোর জন্য ট্রাম্প মুনিরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর মুনির পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভিকে সঙ্গে নিয়ে তেহরান সফর করেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই আলোচনায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হওয়ার কথা জানানো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে মুনিরের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভূমিকা যেমন বাড়ছে, তেমনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জটিল কূটনৈতিক ভারসাম্য
ইরানকে ঘিরে পাকিস্তানের কূটনীতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইসলামাবাদের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইরানের সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্বার্থ।
একই সঙ্গে পাকিস্তানের চীনের সঙ্গে গভীর কৌশলগত সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে।
ফলে ইরান-সংক্রান্ত কূটনৈতিক তৎপরতায় মুনিরের ভূমিকা পাকিস্তানের আঞ্চলিক গুরুত্ব বাড়ালেও এর ফলে সামরিক নেতৃত্বের দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ইমরানের রাজনৈতিক প্রভাব এখনও অটুট
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে পিটিআই-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জাতীয় পরিষদে সরাসরি নির্বাচিত আসনের হিসাবে অন্য যেকোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি আসন লাভ করেন। তবে পিটিআইকে তাদের নির্বাচনী প্রতীক ‘ক্রিকেট ব্যাট’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি জোট সরকার গঠিত হয়। কিন্তু নির্বাচনের পরও ইমরান খানের জনপ্রিয়তা এবং পিটিআইয়ের রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি বিলীন হয়নি।
ইমরানের সমর্থকদের দাবি, তাকে কারাগারে রাখার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে পিটিআইকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান হলো, ইমরানের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক নয় এবং তিনি আদালতের রায়ে দণ্ডিত একজন বন্দি।
ক্রিকেটের মাঠেও ইমরান ইস্যু
ইমরানের রাজনৈতিক প্রভাব সম্প্রতি ক্রিকেট অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার মাইকেল আথারটন ইমরানের দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিমের সাক্ষাৎকার নেন।
সাক্ষাৎকারে তারা তাদের বাবার কারাবন্দিত্ব ও তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। পরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ওই সম্প্রচার নিয়ে স্কাই স্পোর্টসের কাছে অভিযোগ করে।
ইমরানের পরিবারের পক্ষ থেকে তার কারাবাসের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ইমরানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে, ক্রিকেটের কিংবদন্তি থেকে রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হওয়া ইমরান খান এখনো পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত একটি নাম।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইমরানের গুরুত্ব
ইমরানের দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার পরিচিতি রয়েছে। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রবেশ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও হন।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো ক্রিকেটপ্রধান দেশগুলোতে ইমরানের ঐতিহাসিক ক্রিকেট পরিচিতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা, আইন প্রয়োগ, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও ক্যানবেরার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সেপ্টেম্বরে কোন পথে পাকিস্তান?
পাকিস্তানের সামনে এখন দুটি সম্ভাব্য পথ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—একদিকে ইমরানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের বড় ধরনের রাজপথের কর্মসূচি, অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত।
২৭ সেপ্টেম্বরের লং মার্চ যদি বড় আকার ধারণ করে, তাহলে ইসলামাবাদে আবারও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে। আর যদি ইমরান-পন্থী শিবির ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনার কোনো বাস্তব পথ তৈরি হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত প্রশমনের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা বা ইমরান খানের মুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর নেই।
সেপ্টেম্বরের রাজনৈতিক কর্মসূচি তাই শুধু ইমরান খানের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পাকিস্তানের বেসামরিক রাজনীতি, সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
— The Global Journal | ইসলামাবাদ | ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬





