ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন প্রাসাদে থাকছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমান
রিয়াদ, সৌদি আরব | ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ ও দেশটির কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এবং বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন প্রাসাদের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুবরাজের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে তাঁর জন্য বিশেষভাবে বাছাই করা একটি নিরাপত্তা দল। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমান চলাচল এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে যুবরাজের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন। পরবর্তী প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। হামলায় বিমানবন্দরের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হয়।
প্রতিবেদনগুলোতে নিহতদের মধ্যে একজন মিসরীয় বিমানবালার থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরদিন, ১১ অক্টোবর, বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকা অবস্থায় টার্মিনাল ৪-এ আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র বা তার অংশ আঘাত হানে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে অগ্নিকাণ্ড ও নতুন করে হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়। তবে এসব ঘটনার পূর্ণ বিবরণ ও হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বেসামরিক স্থাপনা ও জনজীবনে প্রভাব
রিয়াদে ধারাবাহিক হামলার ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের শব্দ, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আকাশে প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের কমপ্লেক্সে আঘাত হেনেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা দেখাচ্ছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারলেও তার ধ্বংসাবশেষ বেসামরিক স্থাপনার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে বিমানবন্দরে হামলার পর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন এয়ারলাইনস ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে এবং বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত নিয়ে উদ্বেগ
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ধারাবাহিক হামলার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, রাজপ্রাসাদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।
সৌদি আরব বিদেশি অংশীদারদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের কাছেও সামরিক সহায়তা চাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
চাপে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা
নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে পরিচালিত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচিও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দেশটির ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো তেলের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাতের বিকাশ ঘটানো।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিওমের মতো বৃহৎ নগর প্রকল্প, পর্যটন অবকাঠামো এবং রিয়াদকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হলে আন্তর্জাতিক যাতায়াত, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনেও হামলাগুলোকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের মাধ্যমে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। ফলে এ ধরনের স্থাপনায় হামলা দেশটির জ্বালানি রপ্তানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও কূটনৈতিক হিসাব
হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার এবং হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে সৌদি আরব অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথ খতিয়ে দেখছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন অনিশ্চয়তা
রিয়াদের বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। যুবরাজের নিরাপত্তা জোরদার ও বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত প্রাসাদে অবস্থান পরিবর্তনের খবর দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে—যদিও এ বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য মূলত সংবাদমাধ্যমের সূত্রনির্ভর।
সৌদি আরবের সামনে এখন একদিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার প্রশ্ন। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে হামলার তীব্রতা, আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াইনেট, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।





