লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল গাদ্দাফি সশস্ত্র হামলায় নিহত
জিনতান, লিবিয়া |দ্য গ্লোবাল জার্নাল| ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে প্রভাবশালী ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। দেশটির কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজন এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডটি লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে সংঘটিত হয়েছে।
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির আইনজীবী খালেদ আল-জাইদি এবং তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলাদা আলাদা পোস্টে ৫৩ বছর বয়সী গাদ্দাফির মৃত্যুর খবর জানান। তবে প্রাথমিক ঘোষণায় তারা হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত উল্লেখ করেননি।
লিবিয়ার সংবাদমাধ্যম ফাওয়াসেল মিডিয়া উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমানের বরাতে জানায়, রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জিনতান শহরে নিজ বাসভবনে সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হন।
পরবর্তীতে গাদ্দাফির রাজনৈতিক দল এক বিবৃতিতে জানায়, চারজন মুখোশধারী ব্যক্তি তার বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে তাকে হত্যা করে। বিবৃতিতে এই ঘটনাকে “কাপুরুষোচিত ও বিশ্বাসঘাতক হত্যাকাণ্ড” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। দলটির দাবি, হামলাকারীরা হত্যার আলামত গোপন করতে বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা বন্ধ করে দেয় এবং সাইফ আল-ইসলাম তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সংস্থা হাই স্টেট কাউন্সিলের সাবেক প্রধান খালেদ আল-মিশরি একটি “জরুরি ও স্বচ্ছ তদন্ত”-এর দাবি জানিয়েছেন।

সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির কখনো আনুষ্ঠানিক কোনো রাষ্ট্রীয় পদ না থাকলেও ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি কার্যত তার বাবার উত্তরসূরি ও শাসনব্যবস্থার দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে বিবেচিত হতেন। ২০১১ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ও মৃত্যুর মাধ্যমে তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৭২ সালে ত্রিপোলিতে জন্ম নেওয়া সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (LSE) থেকে শিক্ষালাভ করেন এবং পশ্চিমা বিশ্বে একজন সংস্কারপন্থী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ এবং ১৯৮৮ সালের লকারবি বিমান হামলার ক্ষতিপূরণ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে ২০১১ সালে বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি বাবার পক্ষে অবস্থান নেন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়নের অন্যতম নীতিনির্ধারক হয়ে ওঠেন। ওই সময় তিনি প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, “লিবিয়ায় রক্তের নদী বয়ে যাবে।”
বিদ্রোহের পর পালানোর চেষ্টা করলে তিনি জিনতানে আটক হন এবং দীর্ঘদিন বন্দি ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে। ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তিনি জিনতানেই বসবাস করছিলেন এবং হত্যার আশঙ্কায় দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।
২০২১ সালে তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। তার প্রার্থিতা ঘিরে সৃষ্ট বিরোধ ও আইনি জটিলতা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ভেঙে দেয় এবং লিবিয়াকে পুনরায় গভীর রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ঠেলে দেয়।
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ড লিবিয়ার নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।





