ইরানের সঙ্গে সামরিক পরাজয় বরণ করার পর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র -মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি
তেহরান, ইরান | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | The Global Journal
ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ, সফট ওয়ার এবং কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি।
সফট ওয়ার ও কগনিটিভ যুদ্ধবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের এক বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ইরান কোনো পরিস্থিতিতেই আত্মসমর্পণ করবে না এবং শক্তিশালী ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যযুদ্ধও সফল হবে না।
সামরিক সংঘাতের পর অর্থনৈতিক চাপের অভিযোগ
জেনারেল আবদোল্লাহির দাবি, ইরান ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে কৌশলগত ঘাটতি ও পরাজয়ের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন তাদের লক্ষ্য অর্জনে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক চাপ, সফট ওয়ার এবং কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার ব্যবহার করে ইরানের জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের জনগণের দৃঢ়তা এবং দেশটির কর্মকর্তাদের বিচক্ষণতার কারণে এই কৌশলও ব্যর্থ হবে।
ইরান আত্মসমর্পণ করবে না: আবদোল্লাহি
মেজর জেনারেল আবদোল্লাহি বলেন, ইরান এমন একটি জাতি, যারা নিজেদের জাতীয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আস্থা রাখে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর নির্ভর করে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল তেহরান দ্রুত নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অভ্যস্ত হলেও ইরানের ক্ষেত্রে সেই কৌশল কার্যকর হবে না।

সফট ওয়ারকে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখছে তেহরান
জেনারেল আবদোল্লাহি বলেন, বর্তমান সময়ে যুদ্ধ কেবল সামরিক ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনীতি এবং জনমতকে কেন্দ্র করেও সংঘাত পরিচালিত হচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমানে একটি সমন্বিত, সফট ও কগনিটিভ যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইরানের জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল করা এবং দেশের প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আঞ্চলিক প্রতিরোধের মডেল হিসেবে ইরান
বক্তব্যে ইসলামী বিপ্লবের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আলী আবদোল্লাহির মতে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার ধর্মীয় ও জাতীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের সামনে একটি নতুন প্রতিরোধের মডেল উপস্থাপন করেছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অতীতের তুলনায় ভিন্ন হবে এবং এই পরিবর্তন ইরানের জনগণের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রভাব ও শক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিডিয়া ফ্রন্টে পাল্টা লড়াইয়ের আহ্বান
ইরানের সামরিক কর্মকর্তা দেশের গণমাধ্যম ও সফট ওয়ার মোকাবিলায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের সমন্বিত ও কগনিটিভ আক্রমণের মোকাবিলায় বাস্তবতা তুলে ধরা এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।
দাবিগুলোর স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন
তবে মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহির বক্তব্য মূলত ইরানের সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পরাজয়ের স্বীকৃতি কিংবা সামরিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ফলে তাঁর মন্তব্যকে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের সরকারি ও সামরিক বয়ানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তথ্যযুদ্ধ ও কূটনৈতিক চাপও দুই দেশের পারস্পরিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হয়ে উঠেছে। এর ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু সামরিক ময়দানেই নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
— The Global Journal | তেহরান | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬





