ইউক্রেন সংঘাত অবসানে যে প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র নিজেই দিয়েছিল ওয়াশিংটন আর সেটি বাস্তবায়নে প্রস্তুত নয় -রাশিয়া
মস্কো |রাশিয়া| ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইউক্রেন সংঘাত অবসানে যে প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র নিজেই দিয়েছিল, ওয়াশিংটন এখন তা বাস্তবায়নে আর প্রস্তুত নয়—এমন অভিযোগ করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। সোমবার ব্রিকস টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন।
ল্যাভরভ জানান, ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজে রাষ্ট্রপতি পর্যায়ের আলোচনায় ইউক্রেন সংঘাত নিরসনে একটি প্রস্তাব রাশিয়ার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সে সময় মস্কো আলোচনায় প্রস্তুত থাকলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র নিজ অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে অভিযোগ তার।
তিনি বলেন, অ্যাঙ্কোরেজ বৈঠকে সংলাপ ও কিছু সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ ও নিয়ন্ত্রণের নীতি অব্যাহত রেখেছে।
“ইউক্রেন নিয়ে তারা নাকি কিছু প্রস্তাব দিয়েছিল এবং আমরা প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এখন তারাই প্রস্তুত নয়। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না,” বলেন ল্যাভরভ।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, তথাকথিত “গঠনমূলক আলোচনা”র পরপরই যুক্তরাষ্ট্র রুশ তেল কোম্পানি রসনেফট ও লুকোইলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সমুদ্রে রুশ ট্যাংকারগুলোর বিরুদ্ধে কার্যত এক ধরনের “যুদ্ধ” চালাচ্ছে ওয়াশিংটন।
ল্যাভরভ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মতো অংশীদার দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যেন তারা রুশ জ্বালানি না কেনে। আগে ইউরোপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর ফলে ইউরোপকে অত্যন্ত উচ্চমূল্যের মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে বাধ্য করা হয়েছে।
“ইউরোপকে বহু আগেই রুশ জ্বালানি কেনা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে,” বলেন তিনি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি পথ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে, যা রাশিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থায় মস্কো বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের পথ খুঁজছে বলে জানান তিনি।
ল্যাভরভ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও তার মিত্রদের মধ্যে সামরিক-প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ভারতের মতো কৌশলগত অংশীদার ও অন্যান্য ব্রিকস সদস্যদের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামরিক সহযোগিতায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে তিনি জানান, রাশিয়া এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত, কিন্তু কৃত্রিম বাধা তৈরি করছে মূলত আমেরিকানরাই। ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (ওএসসিই) সম্পর্কে ল্যাভরভ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান এখন কার্যত “অপ্রাসঙ্গিক” হয়ে পড়েছে এবং পশ্চিমা আধিপত্যের ধারণায় পরিচালিত।
তিনি স্পষ্ট করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বিলুপ্ত করার পক্ষে নয় রাশিয়া। তবে ব্রেটন উডস কাঠামোর এসব প্রতিষ্ঠানে ব্রিকস দেশগুলোর প্রকৃত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনুযায়ী ভোট ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ল্যাভরভ বলেন, ইউরোপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে—এমন পরিস্থিতিতে মস্কোর জন্য নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি সতর্ক করে দেন, রাশিয়ার নিরাপত্তা স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে—এমন কোনো অস্ত্র ইউক্রেনের ভূখণ্ডে মোতায়েন করতে রাশিয়া অনুমতি দেবে না।
ল্যাভরভের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিকস জোটের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে টার্গেট করা নয়; বরং বিশ্বকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং একতরফা ছাড় আদায়ের মার্কিন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে স্বাধীন ও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা।





