‘তারা আমার বাবাকে হত্যা করতে চাইছে’—পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি ইমরান খানের জীবন নিয়ে সতর্ক করেছেন ছেলে সুলাইমান খান
ইসলামাবাদ, পাকিস্তান | ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তাঁর ছেলে সুলাইমান খান। বাবাকে কারাগারে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং তাঁকে হত্যার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে দায়ী করেছেন সুলাইমান।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। সুলাইমানের দাবি, গত আগস্টের পর থেকে পরিবারের সদস্য কিংবা ইমরান খানের আইনজীবীরা কেউই তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেননি। ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
‘তারা আমার বাবাকে হত্যা করতে চাইছে’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সুলাইমান খান বলেন, গত আগস্টে তাঁর বাবা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে কারাগারে তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাঁকে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মতো পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সুলাইমানের ভাষ্য, এরপর থেকে কেউ তাঁর বাবাকে দেখেনি কিংবা তাঁর কথা শোনেনি।
তিনি আরও বলেন, তাঁর বাবা এখনো পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের একজন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে ভয় পায় বলেই তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাঁর ধারণা। সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটলে এর দায় কার ওপর বর্তাবে, তা নিয়ে যেন কোনো বিভ্রান্তি না থাকে—এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি।
মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ২০১৯ সালে আদালতে শুনানি চলাকালে মারা যান। এর আগে ইমরান খানও নিজের পরিণতি মুরসির মতো হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
তবে ইমরান খানকে হত্যার চেষ্টা চলছে—এটি তাঁর ছেলের অভিযোগ। এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়নি।
চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে উদ্বেগ
ইমরান খানের চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন সুলাইমান। তাঁর অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন।
সুলাইমানের বক্তব্য অনুযায়ী, গত আগস্টে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য তাঁকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে পাকিস্তান সরকার কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কিংবা তাঁকে একাকী বন্দী করে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত আগস্টে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া লিখিত জবাবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইমরান খান সরকারের কোনো নির্বাহী আদেশে আটক নন; বরং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেওয়া সাজা ভোগ করছেন একজন দণ্ডিত বন্দি হিসেবে।

আদিয়ালা কারাগারে বন্দি ইমরান খান
৭৪ বছর বয়সী ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। দুর্নীতি ও ঘুষসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমরান খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই এসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইমরানের বোনদের আটক, পরিবারের ওপর চাপের অভিযোগ
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও চাপের মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সুলাইমান।
সুলাইমান ও তাঁর ভাই কাসিম খানকে বাবার মুক্তির দাবিতে প্রচার চালানোর জন্য পাকিস্তান সফর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নরিন নিয়াজিকে আটক করা হয়। পাঞ্জাব প্রদেশের জনশৃঙ্খলা রক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় পরিকল্পিত বিক্ষোভের আগে তাঁদের আটক করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সোমবার প্রাদেশিক সরকারের কর্মকর্তারা তাঁদের আটকাদেশ আরও ৩০ দিন বাড়ানোর কথা জানান।
মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় পিটিআই সমর্থকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে আয়োজিত একটি সমাবেশে হাজারো সমর্থক অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদের দিকে দীর্ঘ পদযাত্রাও করেন।
তাঁদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইমরান খানের মুক্তি, কারাগারে তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সাক্ষাতের সুযোগ বাড়ানো এবং পছন্দের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ঘিরে বিতর্ক
এদিকে, গত ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
তবে পিটিআই এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে একে ‘জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছে। দলটির অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন দুর্বল করতেই কর্তৃপক্ষ এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইমরানের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক উদ্বেগ
ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং কারাগারে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে চলমান বিরোধ পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাঁর ছেলের জীবননাশের আশঙ্কা এবং সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
তবে সুলাইমান খানের অভিযোগের পাশাপাশি পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। ইমরান খানের নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ২০২৬; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি); পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য।









