হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গুপ্তচর ও বিভ্রান্তিমূলক ড্রোন’ এমকিউএম-১৭০ কবজা করেছে ইরান -দাবি করেছে আইআরজিসির নৌবাহিনী
তেহরান, ইরান | ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাংশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউএম-১৭০ গোয়েন্দা ড্রোনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কবজায় নিয়ে সেটিকে অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। ইরানি বাহিনীর দাবি, তাদের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিট ড্রোনটি শনাক্ত করার পর এর দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি নৌবাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর জানায়, ড্রোনটির লক্ষ্য ছিল পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালিজুড়ে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শনাক্ত করা। তবে ড্রোনটি আটক করা, অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করানো এবং এর মিশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইরানের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশলে ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি
আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, তাদের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিট প্রথমে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাংশে ড্রোনটির উপস্থিতি শনাক্ত করে। এরপর ড্রোনটির দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে সেটিকে নিরাপদে মাটিতে নামিয়ে আনা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা তড়িৎচৌম্বকীয় যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের যোগাযোগ, নেভিগেশন কিংবা নিয়ন্ত্রণসংকেত ব্যাহত করার চেষ্টা করা হয়। সামরিক অভিযানে এ ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করে ড্রোনের কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় ঠিক কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি ইরানি কর্তৃপক্ষ।

ড্রোনটির মিশন নিয়ে তেহরানের বক্তব্য
আইআরজিসি নৌবাহিনীর দাবি, ড্রোনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
ইরানি বাহিনী আরও জানিয়েছে, ড্রোনটি থেকে উদ্ধার করা তথ্য অনুযায়ী, এটি পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলবর্তী দেশগুলোর একটির উপকূল থেকে উড্ডয়ন করেছিল। তবে কোন দেশ থেকে ড্রোনটি উড্ডয়ন করেছিল, সেটি নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ড্রোনটির পরিচয় ও মিশন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া না গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।
এর আগে এমকিউ-১ ড্রোন ধ্বংসের দাবিও করেছিল ইরান
সর্বশেষ দাবির আগে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির আকাশে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি উন্নত এমকিউ-১ ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। তবে এই ঘটনার বিস্তারিত এবং সংশ্লিষ্ট দাবির স্বাধীন যাচাই সম্পর্কেও তথ্য সীমিত।
এমকিউএম-১৭০ ও এমকিউ-১ দুটি পৃথক ড্রোনের নাম। তাই সর্বশেষ ড্রোনটি আটক করার দাবি এবং এর আগে এমকিউ-১ ধ্বংসের দাবিকে পৃথক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তার গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়।
এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক নজরদারি ও ড্রোনের উপস্থিতি নিয়ে যেকোনো ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ড্রোন শনাক্ত, নিয়ন্ত্রণ বা ভূপাতিত করার দাবি দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে। তবে একটি ড্রোন আটক করার দাবি থেকেই বৃহত্তর সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অতীতেও মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম আটক করার দাবি করেছে ইরান
গত এক দশকে ইরানি বাহিনী একাধিক মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম ভূপাতিত বা আটক করার দাবি করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল স্টেলথ ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং পারস্য উপসাগরে ব্যবহৃত কিছু পানির নিচের গ্লাইডার ও পৃষ্ঠতলীয় যানসংক্রান্ত ঘটনা রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা আঞ্চলিক সামরিক প্রতিযোগিতায় গোয়েন্দা নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল এবং ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, ক্ষয়ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
ঘটনার স্বাধীন যাচাই এখনো গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালিতে এমকিউএম-১৭০ ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সেটিকে অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করানোর দাবি ইরানের সামরিক বক্তব্যের অংশ। ড্রোনটির পরিচয়, প্রকৃত মালিকানা, উড্ডয়নের স্থান এবং অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া, ড্রোনটির ছবি বা প্রযুক্তিগত তথ্য এবং নিরপেক্ষ সূত্রের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে দাবিটির সত্যতা ও সামরিক তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সূত্র: আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিবৃতি এবং ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য।
সম্পাদকীয় নোট: ড্রোন আটক, অক্ষত অবস্থায় অবতরণ এবং এর মিশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্যগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব দাবির স্বাধীন যাচাই নিশ্চিত না হওয়ায় এগুলোকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।









