ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি,পরাজয়ের আশংকায় ভোট কারচুপির অভিযোগ তুললেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু—দাবি নাকচ নির্বাচন কমিশনের
জেরুজালেম, ইসরায়েল | ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির মধ্যে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ভোটগ্রহণ শুরুর প্রায় ছয় ঘণ্টা পর তিনি দাবি করেন, “তারা আমাদের কাছ থেকে নির্বাচন চুরি করার চেষ্টা করছে।” তবে দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটের ব্যালটে পদ্ধতিগত কারচুপির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ইসরায়েলে যোগ্য ভোটারদের ৫৫.৭ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে ওই সময় পর্যন্ত এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। ২০২২ সালের জাতীয় নির্বাচনে একই সময় ভোটদানের হার ছিল ৪৭.৫ শতাংশ। কমিশনের হিসাবে, বিকেল ৪টার মধ্যে চার মিলিয়নেরও বেশি ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
যুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার তিন বছরের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এবং বিরোধী দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরব ও বামপন্থী ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ নেতানিয়াহুর
ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নেতানিয়াহু ডানপন্থী সমর্থকদের দ্রুত ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আরব ও বামপন্থী ভোটারদের মধ্যে বেশি ভোটদানের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, আরব অধ্যুষিত এলাকায় ভোটদানের হার বেশি এবং ডানপন্থী সমর্থকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, সবাইকে ভোট দিতে হবে এবং লিকুদ পার্টির সমর্থকদের দ্রুত ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে।
নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং ভোট জালিয়াতির মধ্যে যোগসূত্রের পক্ষে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যে যাচাইযোগ্য প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।

নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতির অভিযোগ বিরোধী নেতার
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আগাম আপত্তি তোলার ভিত্তি তৈরি করছেন। তাঁর মতে, ভোটগ্রহণ চলাকালে কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।
তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া, অভিযোগগুলোর তদন্ত এবং আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
একাধিক দলের অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত করছে কমিশন
নেতানিয়াহুর দল ছাড়াও কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার, নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াহাদ, ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু, মানসুর আব্বাসের রা’আম এবং ইয়োয়াজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি।
অভিযোগগুলোর মধ্যে ব্যালট পেপার হারিয়ে যাওয়া, বিকৃত হওয়া এবং ভোটপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সন্দেহের বিষয় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ব্যালট পেপারে পদ্ধতিগতভাবে কারচুপি করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পৃথক অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভোটারকে ঘুষ দেওয়ার সন্দেহে তিনজন গ্রেপ্তার
ইসরায়েলি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার সন্দেহে আরব রাজনৈতিক দল রা’আমের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে; গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, তেল আবিবে ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়াইর গোলানের কাছে ছুরি নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে প্রথমে তাঁকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হলেও পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছে ছুরি পাওয়া গেছে; তবে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা হয়েছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত করেনি।
বিভিন্ন এলাকায় ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্য
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সারা দেশে ভোটদানের হার ছিল ৩১.৫ শতাংশ। নেগেভ মরুভূমিতে হুরার কাছে আল-আতাওনেহ বেদুইন সম্প্রদায়ের এলাকায় এ হার ছিল ৬৪.১ শতাংশ। বড় শহরগুলোর মধ্যে রাহাতে ভোটদানের হার ছিল ৩৯.৯ শতাংশ এবং মোদিইনে ৩৬.৭ শতাংশ।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১টা পর্যন্ত সেনাসদস্যদের মধ্যে ভোটদানের হার ছিল ৪৮ শতাংশ। ২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময়ে এই হার ছিল ৪৪.৪ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পরও ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ ভোটার থাকলে তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে কেন্দ্র খোলা রাখা হতে পারে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা
উচ্চ ভোটার উপস্থিতি এবং বিভিন্ন দলের অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে ইসরায়েলের নির্বাচনী পরিবেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহু ডানপন্থী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ তাঁর অভিযোগ ও বক্তব্যের সমালোচনা করছে।
তবে উচ্চ ভোটার উপস্থিতি কিংবা বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিজে থেকেই নির্বাচনে কারচুপির প্রমাণ নয়। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন পদ্ধতিগত কারচুপির প্রমাণ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। অভিযোগগুলোর তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ফলাফলই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।









