সৌদি আরব ও হুথি গোষ্ঠীর চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ১৬টি ধারা প্রকাশ,১০ বছরের আগে জোট ছাড়তে পারবে না কোনো সদস্য দেশ
আঙ্কারা, তুরস্ক | ২১ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ১৬টি ধারার পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশিত হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, এটি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছরের মধ্যে কোনো সদস্য দেশ একতরফাভাবে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করতে পারবে না। ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর কোনো দেশ জোট ছাড়তে চাইলে কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্তত তিন মাস আগে লিখিত নোটিশ দিতে হবে।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চুক্তির শর্তগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ও তুরস্কের তুর্কিয়ে টুডে-এর প্রতিবেদনে চুক্তির বিভিন্ন বিধান তুলে ধরা হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর তুরস্ক সরকার চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য দেশটির পার্লামেন্টে পাঠিয়েছে।
এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা, সবার নিরাপত্তার প্রশ্ন
চুক্তির অন্যতম প্রধান বিধান অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আক্রান্ত দেশকে দ্রুত সহায়তা দিতে হবে।
তবে চুক্তিতে সহায়তার ধরন, পরিমাণ কিংবা সেনা মোতায়েনের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। আক্রান্ত দেশের প্রয়োজন, অন্য সদস্যদের সামরিক সক্ষমতা এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সহায়তার ধরন নির্ধারণ করা হবে।
চুক্তিতে যৌথ সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে সামরিক সমন্বয় ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

চুক্তির ১৬ নম্বর ধারায় প্রত্যাহারের বিধান
প্রকাশিত দলিলের ১৬ নম্বর ধারায় চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নিয়ম উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পর কোনো সদস্য দেশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারবে। এ জন্য কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং নোটিশ দেওয়ার অন্তত তিন মাস পর প্রত্যাহার কার্যকর হবে।
চুক্তির জন্য কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। সদস্য দেশগুলোর অনুমোদনের শেষ দলিল জোটের সচিবালয়ে জমা দেওয়ার পর এটি কার্যকর হবে। অর্থাৎ, ১০ বছরের সময়সীমা গণনা শুরু হবে চুক্তি কার্যকরের তারিখ থেকে, স্বাক্ষরের দিন থেকে নয়।
৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষর করেন তিন দেশের শীর্ষ নেতা
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
চুক্তির লক্ষ্য হলো, তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং কোনো সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে সমন্বিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।
তবে চুক্তি কার্যকরের জন্য তিন দেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া আলাদা। তুরস্কে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজকীয় আদেশের ব্যবস্থা রয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন এবং সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
হুথি উত্তেজনায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকির মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে তিন দেশের প্রতিনিধিরা সৌদি আরবে দ্রুত সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন নিশ্চিত করার বিষয়ে সম্মত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় পাকিস্তান প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। তবে কী ধরনের বা কতটা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তুরস্কের এক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সৌদি আরবকে তুরস্কের সহযোগিতা মূলত সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অস্ত্রব্যবস্থার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্য কোনো দেশে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তুরস্ক সেখানে সেনা পাঠাবে না।
ইয়েমেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান
চুক্তির আওতায় সামরিক সহায়তার বিধান পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির অধীনে সেনা মোতায়েনের জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন নেই; তবে এ ধরনের পদক্ষেপ বিদ্যমান আইন ও সরকারি প্রক্রিয়া অনুসারে নেওয়া হবে।
ইসলামাবাদের অবস্থান হলো, চুক্তির আওতায় পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবের ভূখণ্ড রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন, কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে ইয়েমেনে প্রবেশ করবেন না। ২০১৫ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানালেও ইয়েমেনের যুদ্ধে অংশ নিতে সেনা পাঠানোর অনুমোদন দেয়নি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরি করেছে। তবে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং সৌদি আরব–হুথি উত্তেজনা আরও বাড়লে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, সামরিক সক্ষমতা ও চুক্তির কার্যকর প্রয়োগের ওপর।









