সরকার গঠন করতে পারছেন না বেনজামিন নেতানিয়াহু—জোট ছাড়াছে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্ররা, ইসরায়েলে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক পালাবদলের আভাস
জেরুজালেম, ইসরায়েল | ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র আল্ট্রা-অর্থোডক্স ধর্মীয় দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডায়িজম’ (ইউটিজে) নেতানিয়াহুর জোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে সম্ভাব্য নতুন সরকারকে সংসদের বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও দলটির মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের সম্ভাবনা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, সরাসরি মন্ত্রিসভায় যোগ না দিয়েও ইউটিজের সমর্থন বা ভোটদানে বিরত থাকার মাধ্যমে আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের পথ তৈরি হতে পারে। তবে দুই দলের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে—এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
নেতানিয়াহুর জোট ছাড়ার পথে ইউটিজে
ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে ইউটিজের সাতটি আসন রয়েছে। দলটি নেতানিয়াহুর জোট থেকে সরে গেলে তাঁর শিবিরের আসনসংখ্যা ৫৩ থেকে কমে ৪৬-এ নেমে আসতে পারে। বিপরীতে, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের আসনসংখ্যা ৪৮। ফলে ইউটিজের অবস্থান পরিবর্তন সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, ইউটিজে আইজেনকোটের মন্ত্রিসভায় সরাসরি যোগ না দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থাকতে পারে অথবা ভোটদানে বিরত থাকতে পারে। এতে সংসদে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া, সংসদে আটটি আসন থাকা আরব ইসলামপন্থী দল ‘রা’আম’-এর সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও বিরোধী শিবিরের সামনে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
ইয়েশিভা শিক্ষার্থীদের সামরিক ছাড় নিয়ে বিরোধ
নেতানিয়াহুর ওপর ইউটিজের অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ইয়েশিভা’র শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন। দলটি দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে আইনগত নিশ্চয়তা চেয়ে আসছে। কিন্তু প্রত্যাশিত আইন পাস না হওয়ায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউটিজের নেতাদের ধারণা, নেতানিয়াহুর হাতে এখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো আসন নেই। ফলে তাঁর সঙ্গে জোটে থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক ছাড়ের বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনাও কমে গেছে।
দলটির ধর্মীয় নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, যে রাজনৈতিক পক্ষ সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে, ধর্মীয় নেতৃত্বের অনুমোদন সাপেক্ষে তাদের সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
আইজেনকোটের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ সামরিক নিয়োগ আইন
ইউটিজের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সামরিক নিয়োগের প্রশ্ন। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট শুরু থেকেই আল্ট্রা-অর্থোডক্স শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সামরিক ছাড় দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন।
ফলে ইউটিজের দাবি এবং আইজেনকোটের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা সহজ হবে না। তবে দল দুটির মধ্যে নিম্নপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আলোচনার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে সামরিক নিয়োগসংক্রান্ত খসড়া আইন সংসদে উত্থাপনের সময় ইউটিজের সদস্যদের প্রতিবাদ জানানো, কিন্তু চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে অংশ না নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এতে দলটি নিজেদের আপত্তি প্রকাশের সুযোগ পাবে, আবার আইজেনকোটের সম্ভাব্য সরকারের সংসদীয় অবস্থানও দুর্বল হবে না। তবে এটি এখনো আলোচনাধীন একটি প্রস্তাব মাত্র।
নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের পথ বন্ধ বলে দাবি লাপিদের
এদিকে, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদায়ী বিরোধীদলীয় নেতা এবং ‘বি’ইয়াহাদ’ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ইয়ার লাপিদ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় লাপিদ বলেন, বিরোধী শিবির প্রত্যাশিত বড় ব্যবধানের জয় না পেলেও আসনসংখ্যার হিসাবে নেতানিয়াহুবিরোধী পক্ষ এগিয়ে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি সরাসরি ‘নকআউট’ জয় না হলেও পয়েন্টের হিসাবে বিরোধী জোটের বিজয়।
নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি। এর মধ্যে ১৩টি আসন এসেছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স দল ইউটিজে ও শাসের কাছ থেকে। লাপিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুই দলের সমর্থন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরের আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-এ। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তাঁর পক্ষে কঠিন।
লাপিদ আরও স্বীকার করেন, বিরোধী সমর্থকেরা নির্বাচনে আরও স্পষ্ট ও তাৎক্ষণিক জয় আশা করেছিলেন। তবে নির্বাচনের ফল এবং নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা কমে যাওয়াকে তিনি বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেন।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের অপেক্ষা
ইউটিজের সম্ভাব্য অবস্থান পরিবর্তন, আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের আলোচনা এবং লাপিদের বক্তব্য—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তবে সরকার গঠনের জন্য শুধু আসনসংখ্যার হিসাবই যথেষ্ট নয়; সংসদে আস্থা ভোট, দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সমর্থন এবং নীতিগত বিষয়ে সমঝোতাও প্রয়োজন। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির প্রশ্নে ইউটিজে ও আইজেনকোটের মতপার্থক্য বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে।
ইউটিজে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর জোট ছাড়বে কি না এবং আইজেনকোটের সম্ভাব্য সরকারকে সমর্থন দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দলটির অবস্থান বদলালে নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠবে। ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে, তা নির্ধারণে এখন দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও সংসদীয় সমঝোতাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২; বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বক্তব্য।









