‘ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপ্রয়োজনীয়’ যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প’ —সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
মোরো, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র | ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তা আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তাঁর দাবি, চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে, বহু মার্কিন সেনা ও নাগরিক হতাহত হয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের মোরো শহরে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব মন্তব্য করেন ওবামা। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সমাবেশে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওবামা যুদ্ধটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করে এর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
‘কূটনীতির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল’
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওবামা তাঁর প্রেসিডেন্সির সময়কার পারমাণবিক চুক্তির প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখতে সামরিক হামলার পরিবর্তে কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
ওবামা বলেন, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না, কারণ তাঁর প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৫ সালে তেহরানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমাকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়নি। আমি কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছিলাম।”
২০১৫ সালের চুক্তিটি, আনুষ্ঠানিকভাবে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) নামে পরিচিত। এর আওতায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমে নির্দিষ্ট সীমা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ছিল। ওবামা তাঁর বক্তব্যে ট্রাম্পের ওই চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমা নিয়ে উদ্বেগ
যুদ্ধের সামরিক মূল্য তুলে ধরে ওবামা বলেন, সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও সামরিক ঘাঁটিগুলো হামলার শিকার হয়েছে এবং বহু মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন। তাঁর দাবি, যুদ্ধ পরিচালনায় ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
ওবামার ভাষ্য, “আমাদের মিত্র ও সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা হয়েছে। মার্কিন নাগরিকেরা নিহত হয়েছেন, শত শত মার্কিন নাগরিক আহত হয়েছেন। আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেছে, যা আমাদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সামরিক অভিযানের তাৎক্ষণিক ফলাফলের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কতটা কমেছে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় কী পরিমাণ প্রভাব ফেলেছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি
ওবামার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। সংঘাতের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও জ্বালানির সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
ওবামার দাবি, যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরান কার্যত এমন প্রভাব অর্জন করেছে, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, “এ কারণেই তেলের দাম বেড়েছে।”
তাঁর মতে, সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও প্রভাব ফেলছে। তেল ও ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা
ওবামার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারণা তীব্র হচ্ছে। নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর ভোটারদের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জর্জিয়ার সমাবেশে ওবামা ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি প্রশাসনের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেই যে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জিত হবে, তা নিশ্চিত নয়। বরং যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক সম্পদের ক্ষয়, মিত্রদের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তবে ওবামার বক্তব্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্র্যাট দলের নির্বাচনী প্রচারণার অংশ। তাঁর অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের বক্তব্য, সামরিক ক্ষয়ক্ষতির যাচাইকৃত তথ্য এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অন্যান্য কারণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সামরিক সাফল্য বনাম কৌশলগত ফলাফল
ওবামার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এবং যুদ্ধের মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে যদি ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে, মিত্র ও সামরিক ঘাঁটি হামলার ঝুঁকিতে পড়ে এবং প্রতিপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ জলপথে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়, তাহলে অভিযানের কৌশলগত সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অন্যদিকে, যুদ্ধের সামগ্রিক ফল নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বর্তমান অবস্থা, সংঘাতে উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ঘিরে ওবামার সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সংঘাতের প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সামনে এনেছে। তবে যুদ্ধের প্রকৃত কৌশলগত ফলাফল নির্ধারণের জন্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত সামরিক ও অর্থনৈতিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আল-জাজিরা; ডন; ওবামার নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য।









