পোল্যান্ডে তীব্র রাজনৈতিক সংকট: সাংবিধানিক আদালত নিয়ে টাস্ক সরকারের সঙ্গে বিরোধ, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ
ওয়ারশ, পোল্যান্ড | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানী ওয়ারশে সাংবিধানিক আদালতের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় আদালতের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে বস্তু নিক্ষেপের অভিযোগে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিবাদে কয়েক ডজন মানুষ সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ আদালত চত্বরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
টাস্ক সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ এবং সাবেক ক্ষমতাসীন ডানপন্থী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস (পিআইএস)-এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে এই সংঘর্ষ পোল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।
আদালতের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার দায়মুক্তি প্রত্যাহারের উদ্যোগ
পোল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী ভালদেমার ঝুরেক জানিয়েছেন, সাংবিধানিক আদালতের প্রেসিডেন্ট বোগদান শভিয়েনচকোভস্কি এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট বার্তোমিয়েই সোখানস্কির দায়মুক্তি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
টাস্ক সরকারের দাবি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আদালতের বিতর্কিত নিয়োগ এবং কার্যক্রমের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, পিআইএস সমর্থকদের অভিযোগ, সরকারের এই পদক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর হস্তক্ষেপ।
বিক্ষোভের সময় আদালত ভবনে প্রবেশের চেষ্টা ঠেকাতে পুলিশ নিরাপত্তা জোরদার করে এবং দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করে।

সেনেগাল সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কি
ঘটনার সময় সেনেগালের উদ্দেশে সফররত ছিলেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি। পরিস্থিতির কথা জানার পর তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “এমন মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের পোল্যান্ডে থাকা প্রয়োজন। আমি সেনেগাল সফর সংক্ষিপ্ত করছি। দেশে ফিরছি।”
দেশে ফেরার পর সাংবিধানিক আদালতের প্রবেশপথে অবস্থানরত কয়েকজন বিচারকের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। আদালত ভবনে প্রবেশের জন্য ফটকের শিকল কাটার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “আপনারা সাংবিধানিক আদালতের বিচারক নন!”
বিচারকদের বৈধতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
সাংবিধানিক আদালত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকারের ফৌজদারি পদক্ষেপের মুখে থাকা দুই বিচারপতিই আইনগতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ বিচারক। আদালত আরও দাবি করেছে, এসব পদক্ষেপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ‘অভ্যুত্থানের অপরাধ’ করছেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী টাস্ক বলেছেন, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা তাঁর সরকারের দায়িত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, পিআইএসের শাসনামলে আইনের শাসনের অবক্ষয়ের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন এবং কখনো কখনো বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
পিআইএস সরকারের আমল থেকেই বিচার বিভাগ নিয়ে বিরোধ
পোল্যান্ডের বিচার বিভাগ নিয়ে বর্তমান সংকটের সূত্রপাত ২০১৫ সালে পিআইএস ক্ষমতায় আসার পর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে। ওই সময় দলটি সাংবিধানিক আদালতে বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।
সাংবিধানিক আদালত দেশটির আইন ও সরকারি সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা পর্যালোচনা করে। তাই আদালতের বিচারক নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধ পোল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালত (সিজেইইউ) অতীতে পিআইএস সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া তিন বিচারকের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের পার্লামেন্টের বৈধভাবে পূরণ করা পদে পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
রাষ্ট্রপতির ভেটোতে বাধাগ্রস্ত বিচার বিভাগ সংস্কার
বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও টাস্ক সরকার পিআইএস আমলের সব পরিবর্তন বাতিল করতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কি এবং তাঁর পূর্বসূরি আন্দ্রেজ দুদার ভেটোর কারণে সরকারের কয়েকটি সংস্কার উদ্যোগ বাধার মুখে পড়ে।
এ ছাড়া, গত মার্চে পার্লামেন্ট পাঁচজন সাংবিধানিক আদালতের বিচারক নির্বাচন করলেও নাভরোৎস্কি তাঁদের শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট।
এ পরিস্থিতিতে টাস্কের কিছু সমর্থকও অভিযোগ করেছেন, পিআইএস সরকারের সময়কার বিচার বিভাগীয় পরিবর্তন সংশোধনে প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
আগামী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনা
আগামী বছর পোল্যান্ডে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে বিচার বিভাগ নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানকে কেউ কেউ টাস্কের রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপকে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
সাংবিধানিক আদালতের প্রেসিডেন্ট শভিয়েনচকোভস্কি পিআইএস সরকারের সময় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। টাস্কের অভিযোগ, তিনি পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন বিচারকদের আদালতে দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, পিআইএসের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক বিচারমন্ত্রী জবিগনিউ জিওব্রো সরকারের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি একে সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর ‘নগ্ন ও অপরাধমূলক আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেন এবং সমর্থকদের জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পোল্যান্ডের সাংবিধানিক সংকট কোন দিকে যাচ্ছে?
সাংবিধানিক আদালতের বিচারকদের নিয়োগের বৈধতা, দায়মুক্তি প্রত্যাহারের উদ্যোগ এবং প্রেসিডেন্ট ও সরকারের পরস্পরবিরোধী অবস্থান পোল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একদিকে টাস্ক সরকার বিচার বিভাগের সংস্কার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছে, অন্যদিকে পিআইএস ও প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে সরকারের পদক্ষেপের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, সরকারের পদক্ষেপ এবং প্রেসিডেন্টের অবস্থানই পোল্যান্ডের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি); পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত; প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ও প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য।









