যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে নতুন প্রস্তাব জানিয়েছে কাতারের আমির শেখ তামিম
তেহরান, ইরান | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বন্ধে নতুন একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে কাতার। তবে উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রস্তাব কি না, তা নিয়ে তেহরান ও মধ্যস্থতাকারীদের বক্তব্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার দাবি, রোববার ইরানের কাছে প্রস্তাবটি তুলে ধরা হয়েছে এবং সপ্তাহের শেষ নাগাদ তেহরানের জবাব পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, কাতার কেবল কিছু ‘অগ্রহণযোগ্য ধারণা’ জানিয়েছে, যা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব নয়।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চলার মধ্যেই নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামলার হুমকি এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের বিষয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাত দিনের সময়সীমায় আস্থা তৈরির পরিকল্পনা
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কাতারের খসড়া প্রস্তাবে দুই পক্ষের উদ্বেগ মোকাবিলায় সাত দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। প্রতিদিনের জন্য আস্থা তৈরির পদক্ষেপও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আগামী সপ্তাহের শুরুতে এই প্রক্রিয়া চালু হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে কয়েকটি দেশ গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করতে পারে বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। তবে কোন কোন দেশ এই দায়িত্ব পালন করবে, সাত দিনের প্রতিটি ধাপে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং প্রস্তাবটির পূর্ণাঙ্গ শর্ত কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কাতারের উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে স্বীকার করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানের কাছে উপস্থাপিত ধারণাগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই প্রস্তাবটির প্রকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতবিরোধ
শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায়, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা শুরুর পর্যায় থেকেই ইরানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হোক।
অন্যদিকে, তেহরানের অবস্থান হলো—আলোচনায় অগ্রগতির আগে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে। অর্থাৎ, দুই পক্ষের মধ্যে শুধু যুদ্ধবিরতির শর্ত নয়, আলোচনার অগ্রাধিকার নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হওয়ার পশ্চিমা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ সফল করতে হলে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামুদ্রিক অবরোধের মতো জটিল বিষয়গুলোতে সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে।
ট্রাম্পের হামলার হুমকি, পাল্টা পদক্ষেপের প্রস্তুতির দাবি
কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবার হামলা চালানোর হুমকি দেন বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল লক্ষ্য করে আক্রমণের বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে তেহরান।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা এ বিষয়ে কী ধরনের প্রস্তুতি চলছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি কূটনৈতিক সমঝোতার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে নতুন সামরিক হামলা হলে সংঘাতের পরিধি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তেহরানে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা
উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব যোগাযোগের লক্ষ্য ও আলোচনার সুনির্দিষ্ট ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত না হলেও, আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানোর প্রচেষ্টাকে সামনে এনেছে।
এর আগে মঙ্গলবার কাতার জানিয়েছিল, মধ্যস্থতার উদ্যোগ সফল করতে ইরানকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর প্রতি হুমকি বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এই পথে চলাচল ব্যাহত হলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে
ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, যুদ্ধের আগের পর্যায়েই উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিক হামলার শিকার হয়েছিল। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াইও নতুন করে শুরু হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যুদ্ধটির প্রভাব পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমর্থনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে জনসমর্থনের পরিবর্তন নির্ধারণে নির্দিষ্ট জরিপ, তারিখ ও নমুনার তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শান্তি উদ্যোগের সামনে প্রধান বাধা কী?
কাতারের প্রস্তাব ঘিরে তৈরি হওয়া মতবিরোধ থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধের পথে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা রয়েছে। প্রথমত, তেহরান ও ওয়াশিংটন আলোচনার অগ্রাধিকার নিয়ে একমত নয়। দ্বিতীয়ত, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে সমঝোতা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং নতুন সামরিক হামলার আশঙ্কা আলোচনার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
সাত দিনের আস্থা তৈরির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা আলোচনার জন্য একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা এবং প্রস্তাবের শর্তগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতির ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বন্ধে কাতারের নতুন উদ্যোগ কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা সামনে এনেছে। তবে প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিক কি না, তা নিয়েই যখন মতবিরোধ রয়েছে, তখন চূড়ান্ত সমঝোতার পথে অগ্রগতি কতটা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন অবরোধ, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সমাধান খুঁজে পাওয়া হবে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একই সঙ্গে নতুন সামরিক হামলা ও পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।









