ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ও ভূমি দখলের ঘটনায় ইসরায়েলের পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ সংসদ ক্লাইভ লুইস
লন্ডন, যুক্তরাজ্য | ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা, ভূমি দখল ও উচ্ছেদের ঘটনায় শুধু অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের নয়, দেশটির সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য ক্লাইভ লুইস। তাঁর মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নিপীড়ন বিচ্ছিন্ন কিছু বসতি স্থাপনকারীর কর্মকাণ্ড নয়; এর পেছনে ইসরায়েল সরকারের নীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভূমিকা রয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা-তে ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে এসব কথা লিখেছেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি ও নরউইচ সাউথের সংসদ সদস্য ক্লাইভ লুইস। নিবন্ধে তিনি পশ্চিম তীরে প্রবেশের চেষ্টা, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আট ঘণ্টা আটকে থাকার অভিজ্ঞতা এবং ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি তুলে ধরে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আরও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আহ্বান জানান।
পশ্চিম তীরে প্রবেশে বাধা ও আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগ
ক্লাইভ লুইসের বর্ণনা অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে আরও দুই ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের প্রায় আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ ও আটকে রাখার পর প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়।
নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন দুর্ভোগের তুলনা করা যায় না উল্লেখ করে লুইস বলেন, অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা, ভূমি দখল ও উচ্ছেদের মুখোমুখি হচ্ছেন।
তাঁর অভিযোগ, গাজায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান এবং প্রাণহানির পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনিদের বসতি ও অস্তিত্ব সংকুচিত করার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদি জাতিগত উচ্ছেদের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এগুলো নিবন্ধে তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন ও অভিযোগ।
ইসরায়েলি মন্ত্রীর বক্তব্য ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ
নিবন্ধে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন লুইস। তাঁর দাবি, গত মাসে স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে গাজায় পরিচালিত অভিযানের মতো সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে আসা ঠেকাতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের দুটি প্রতিনিধিদলকে পশ্চিম তীরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লুইস। নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, গাজায় গত তিন বছরে ইসরায়েলি হামলায় ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া, গত সপ্তাহে হেবরনে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের দৃশ্য ধারণ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বসতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত নিষেধাজ্ঞার দাবি
অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন লুইস। তবে তাঁর মতে, ঘোষণার পর ছয় মাস অপেক্ষা না করে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু বসতি স্থাপনকারী ব্যক্তি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। বসতি সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করতে এসব বসতির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা কোম্পানি, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, বিমা সরবরাহকারী এবং নজরদারি প্রযুক্তি প্রদানকারীদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে।
লুইসের প্রস্তাব অনুযায়ী, অবৈধ বসতি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বন্ধ করাকে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা উচিত।
ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিধিনিষেধ আরও কঠোর করার আহ্বান
ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান বিধিনিষেধের ফাঁক বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এই ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা।
বিশেষ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত উড়োজাহাজের লাইসেন্স বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিম তীরে দখলদারিত্ব বজায় রাখা বা গাজায় সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন সামরিক সক্ষমতা সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
লুইসের মতে, অস্ত্র রপ্তানির বিধিনিষেধ কার্যকর করতে হলে শুধু সরাসরি অস্ত্র বিক্রিই নয়, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সামরিক সহায়তার বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করতে হবে।
গাজায় মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের প্রশ্ন
গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন লুইস।
তিনি বলেন, গাজায় শুধু জরুরি সহায়তা পাঠানোই যথেষ্ট নয়; অঞ্চলটির ওপর অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাঁর মতে, মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশনার প্রসঙ্গ
নিবন্ধের শেষাংশে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেছেন লুইস। তাঁর বক্তব্য, ইসরায়েলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করে—এমন বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক কার্যক্রম বন্ধ করা যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
তিনি মনে করেন, এ কারণে নিষেধাজ্ঞার পরিধি কেবল অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বসতি অর্থনীতি, সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ইসরায়েল সরকারের সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামো পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের নীতিতে পরিবর্তনের দাবি
ক্লাইভ লুইসের আহ্বান মূলত যুক্তরাজ্যের ইসরায়েলনীতি ও নিষেধাজ্ঞার পরিধি নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এনেছে। তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা অবৈধ বসতি সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং গাজায় মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ব্রিটিশ সরকার নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিষয়। লুইসের নিবন্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রস্তাবগুলো তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পশ্চিম তীর ও গাজার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর মূল্যায়নে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও আনুষ্ঠানিক নথি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আলজাজিরা, ৩০ অক্টোবর ২০২৬; ব্রিটিশ সংসদ সদস্য ক্লাইভ লুইসের মতামতধর্মী নিবন্ধ।









