২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন।জনমত জরিপে আস্থাহীনতায় অস্বাভাবিক ভাবে পিছিয়ে কঠিন পরীক্ষায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট
জেরুজালেম, ইসরায়েল | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোটের সরকার গঠনের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিরোধী জোটও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় নির্বাচনের পর সরকার গঠনে আরব রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য জেরুজালেম পোস্টের বিভিন্ন জনমত জরিপের সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, গাদি আইজেনকট, ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির এবং নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট—উভয়ই ১২০ সদস্যের নেসেটে ৫৪টি করে আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, আরব রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আটটি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ফলে জরিপের এই চিত্র অনুযায়ী, কোনো শিবিরই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারছে না। নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে আরব দলগুলোর সমর্থন নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
আরব দলগুলোর সমর্থন পেতে পারে বিরোধী জোট
আরব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ইউসেফ জাবারিন জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে তাঁর দল নিজেদের হাতে থাকা সব ধরনের রাজনৈতিক উপায় ব্যবহার করবে। তবে তিনি আইজেনকট–লাপিদ–বেনেটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এ প্রকাশিত বক্তব্যে জাবারিন বলেন, নির্বাচনের পর ইসরায়েলের যেকোনো রাজনৈতিক সমীকরণে তাঁর দল নিজেদের শর্ত তুলে ধরবে। নেতানিয়াহু সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখতে চান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, আরব দলগুলো সরাসরি কোনো জোটে যোগ না দিয়েও সরকার গঠন বা সংসদীয় সমীকরণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবে তাদের সমর্থন কোন শর্তে এবং কোন পক্ষের জন্য কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরব রাজনৈতিক দলগুলো?
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকার গঠনের মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। তবে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোকে ক্ষমতার বাইরে রাখার প্রচেষ্টায় মধ্যপন্থী ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচনায় এসেছে।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে মানসুর আব্বাসের ইউনাইটেড আরব লিস্ট অংশ নিয়েছিল। ওই সরকার গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরানো সম্ভব হয়েছিল।
তবে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এবং জোটের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে রাজনৈতিক সমঝোতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২২ সালে ওই সরকার ভেঙে যাওয়ার পর নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার মিত্র কট্টর ডানপন্থী দলগুলো সরকার গঠনের সুযোগ পায়।
এই অভিজ্ঞতার কারণে আসন্ন নির্বাচনে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের সমর্থন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
জরিপে আসনসংখ্যার চিত্র
চ্যানেল ১২-এর একটি জনমত জরিপে বিরোধী শিবিরের জন্য ৫৪টি আসন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য ৪৯টি আসন এবং আরব দলগুলোর জন্য আটটি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই জরিপের হিসাব অনুযায়ীও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সীমায় কোনো শিবির এককভাবে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে নির্বাচনের পর ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে জনমত জরিপ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নয়। নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং দলগুলোর মধ্যে জোট বা সমঝোতার পরিবর্তনের কারণে পূর্বাভাস বদলে যেতে পারে।
৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রথম নির্বাচন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ওই হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের বিস্তার দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
গাজায় যুদ্ধের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে সামরিক উত্তেজনা ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।
প্রতিবেদনে চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা এবং সৌদি আরব–হুথি সংঘাতের নতুন করে তীব্র হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পূর্ণ প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক পরিস্থিতি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
নির্বাচনের পর কী হতে পারে?
আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। একইভাবে বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে ভোটের ফলাফলের ওপর।
যদি কোনো শিবির এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে আরব দলগুলোর সমর্থন, ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমঝোতা সরকার গঠনের পথ নির্ধারণ করতে পারে।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচন তাই শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য নয়, ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি, যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনার দিকনির্দেশনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনমত জরিপের ভিত্তিতে এখনই নির্বাচনের ফল বা ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।





