ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকলে সৌদি আরব একসময় ‘সবকিছু হারাতে পারে’—সতর্ক করলেন ইরানি বিশ্লেষক অধ্যাপক সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আলী মারান্দি
তেহরান, ইরান | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব গুরুতর অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানি বিশ্লেষক ও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আলী মারান্দি। তাঁর আশঙ্কা, সংঘাত আরও তীব্র হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
সম্প্রতি আল-মায়াদিনের ‘দ্য গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডঅফ: ইরান অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব মন্তব্য করেন মারান্দি। তিনি বলেন, সৌদি আরবের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইয়েমেনের সঙ্গে সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক অবস্থান চাপে পড়তে পারে।
তেলনির্ভর অর্থনীতি নিয়ে সতর্কবার্তা
মারান্দির মতে, ইরান কিংবা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় সৌদি আরবের অর্থনীতিতে তেল খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো বা তেল রপ্তানির পথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, সৌদি আরব ইতিমধ্যে সংঘাতের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, “এই যুদ্ধ চলতে থাকলে সৌদি আরব সবকিছু হারাবে।”
তবে এটি মারান্দির ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও সতর্কবার্তা; সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

হুথিদের হামলার সক্ষমতা নিয়ে দাবি
ইরানি এই বিশ্লেষক বলেন, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন—যারা নিজেদের আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত করে—সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা রাখে। তাঁর দাবি, গোষ্ঠীটি এখন পর্যন্ত হিসাব-নিকাশ করেই হামলা চালাচ্ছে এবং আরও শক্তিশালী আঘাত হানার সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলে তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন।
মারান্দির আশঙ্কা, সংঘাত বাড়লে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারে। এতে জ্বালানি অবকাঠামো, তেল পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
তবে হুথিদের সম্ভাব্য সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ হামলার মাত্রা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
সৌদি যুবরাজকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানোর দাবি
মারান্দির বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সৌদি আরবকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে চায় না। বরং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সংঘাতের পরিণতি উপলব্ধি করিয়ে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিতে বাধ্য করাই হুথিদের লক্ষ্য বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর দাবি, সৌদি আরব যদি সামরিক হামলা বাড়ায়, তাহলে হুথিরাও পাল্টা হামলা জোরদার করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে মারান্দি মূলত সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিণতি এবং সামরিক উত্তেজনা কমানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নিয়েও উদ্বেগ
মারান্দি আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে সৌদি শাসকগোষ্ঠীকে দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে। তেল রপ্তানি থেকে আয় কমে গেলে সরকারি রাজস্ব, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নেও প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথা তিনি তুলে ধরেন।
তবে সৌদি আরবের অর্থনীতি শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটি পর্যটন, আর্থিক পরিষেবা, শিল্প, অবকাঠামো এবং অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে সংঘাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে হামলার পরিধি, জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি এবং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
মারান্দি যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের সম্পদ, সরকারি বন্ড এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর প্রশ্ন, ভবিষ্যতে সৌদি আরব বা কাতারের শাসকেরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অর্থ প্রত্যাহার করতে চাইলে মার্কিন প্রশাসন কতটা সহযোগিতা করবে।
মার্কিন বন্ডবাজার ও দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সহজেই সৌদি আরবের অর্থ প্রত্যাহারের সুযোগ দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব বা কাতারের বিনিয়োগ প্রত্যাহারে বাধা দেবে—এমন দাবির পক্ষে তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের ধরন, চুক্তি, বাজারের অবস্থা এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর।
আঞ্চলিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে মারান্দির বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির তেল উৎপাদন, রপ্তানি বা পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপত্তার ওপর।
মারান্দির বক্তব্যে সৌদি আরবের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। তবে তাঁর বক্তব্যকে বিশ্লেষকের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত; সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্বাভাস হিসেবে নয়।





