প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ ইন্দোনেশিয়া,এটা কৌশল নাকি কূটনৈতিক ঝুঁকি?
জাকার্তা, ইন্দোনেশিয়া | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইন্দোনেশিয়া সরকার প্রস্তাবিত বহুজাতিক গাজা স্থিতিশীলতা বাহিনীতে সর্বোচ্চ ৮,০০০ সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে। প্রেসিডেন্ট Prabowo Subianto-এর প্রশাসন জানিয়েছে, এই মোতায়েন পরিকল্পনা Donald Trump-এর উদ্যোগে ঘোষিত তথাকথিত বোর্ড অব পিস (BoP) কাঠামোর আওতায় বিবেচনাধীন।
সরকারি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জাকার্তার এই সিদ্ধান্ত ইন্দোনেশিয়ার বৈদেশিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এ পদক্ষেপ দেশটির ঐতিহ্যগত “মুক্ত ও সক্রিয়” পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
গাজা মিশন: ঝুঁকিপূর্ণ প্রেক্ষাপট
প্রস্তাবিত মোতায়েনের ক্ষেত্র Gaza Strip—যা বিশ্বের অন্যতম অস্থিতিশীল ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রচলিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মতো সুস্পষ্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিক ম্যান্ডেটের আওতাভুক্ত নয়। ফলে হাজারো সেনা মোতায়েন ইন্দোনেশিয়াকে এমন এক জটিল নিরাপত্তা বাস্তবতায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হবে।
‘মুক্ত ও সক্রিয়’ নীতির প্রশ্ন
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরে “Free and Active” নীতিতে দাঁড়িয়ে আছে, যার বৌদ্ধিক শিকড় Djuanda Declaration এবং Bandung Conference-এ নিহিত। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি নিজেকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ একটি কাঠামোতে অংশগ্রহণ ইন্দোনেশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বলয়ে প্রতীকীভাবে যুক্ত করছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এতে চীন, রাশিয়া এবং আসিয়ান অংশীদারদের সঙ্গে জাকার্তার কৌশলগত ভারসাম্য প্রভাবিত হতে পারে বলে মত দেওয়া হচ্ছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে নৈতিক দ্বন্দ্ব
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এমন এক উদ্যোগে অংশগ্রহণ—যা ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত—দেশটির অভ্যন্তরীণ জনমত ও আন্তর্জাতিক ফোরামে নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বিশেষ করে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের মতো সিদ্ধান্ত অতীতে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ফলে BoP কাঠামো ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা না দিলে, ইন্দোনেশিয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিবেচনা
৮,০০০ সেনা মোতায়েন কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেডের সমান। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর নাটুনা সাগরে চলমান উত্তেজনা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের বাহিনী পাঠানো ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া, বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের ব্যয়ও কম নয়। লজিস্টিক, রসদ ও অবকাঠামোগত ব্যয় জাতীয় বাজেটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সংসদীয় পর্যবেক্ষণ ও জনসম্মুখে বিস্তৃত বিতর্ক ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে নাগরিক সমাজের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ভবিষ্যৎ সুনামের ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অত্যন্ত মেরুকৃত। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক পরিবর্তন হলে ট্রাম্প-যুগের উদ্যোগগুলো পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া একটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর প্রকল্পে সম্পৃক্ত থাকার কারণে কূটনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, জাকার্তার সামনে এখন মূল প্রশ্ন—এই পদক্ষেপ কি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় কৌশলগত অগ্রগতি, নাকি একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক জুয়া?
— দ্য গ্লোবাল জার্নাল



