Breaking
‘ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে ইউক্রেনে নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়ে গেছে’ -মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

‘ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে ইউক্রেনে নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়ে গেছে’ -মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

Share:

Written By

News Desk

‘ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে ইউক্রেনে নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়ে গেছে’ -মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র | ১১ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল

ইউক্রেনের যুদ্ধ অবসানের প্রসঙ্গে দেশটিতে নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে জ্বালানির উচ্চমূল্যের জন্য দায়ী করেছেন তিনি। ট্রাম্পের এমন মন্তব্য এবং রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল কেনার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ডিজেল চুক্তির ঘোষণার পরদিন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, দেশটির জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রুশ হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, রাজধানী কিয়েভেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন শহরটির মেয়র ভিতালি ক্লিচকো।

জাপোরিঝঝিয়া ও কিয়েভে রুশ হামলা

ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে আবাসিক ভবনে রুশ বিমান থেকে নিক্ষেপ করা বোমার আঘাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। হামলার পর উদ্ধার ও জরুরি কার্যক্রম চালানো হয়।

এদিকে, কিয়েভে দিনের বেলায় চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মেয়র ভিতালি ক্লিচকো। ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলারও খবর পাওয়া গেছে।

যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দূরপাল্লার আকাশপথে হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্থলযুদ্ধে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও রাশিয়ার ধারাবাহিক বোমাবর্ষণ মোকাবিলায় ইউক্রেন চাপের মুখে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দিনে এসব হামলায় ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা ট্রাম্পের

শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও তিনি জানান।

ট্রাম্পের ঘোষণাটি রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের চাপ প্রয়োগের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা তৈরি করেছে। ইউক্রেনের আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়লে তা দেশটির সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা জোরদার করতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য মোকাবিলা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোক্তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বিষয়টিও ট্রাম্পের এই উদ্যোগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলেনস্কির সমালোচনা: ‘রাশিয়ার পছন্দ হলো যুদ্ধ’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টির সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এমন সিদ্ধান্তের পর রাশিয়া জাপোরিঝঝিয়ার আবাসিক ভবনে বোমা হামলা চালিয়েছে।

জেলেনস্কির মতে, রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর পদক্ষেপকে মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। টেলিগ্রামে দেওয়া আরেকটি বার্তায় তিনি বলেন, রাশিয়ার পছন্দ হলো যুদ্ধ।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, রাশিয়ার রপ্তানি আয় থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ড্রোনের উন্নয়ন, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং যোদ্ধা নিয়োগে ব্যয় হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা সীমিত করা গেলে মস্কোর যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য অংশীদারদের রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার পদক্ষেপ জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার বিষয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানান তিনি।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হয়েছে। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইউক্রেনের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের জন্য আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গোলাবারুদ সরবরাহ করা হবে।

ইউক্রেনের নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা

কিয়েভের স্বাধীনতা চত্বরে নিহত সেনাদের স্মৃতিসৌধে জড়ো হওয়া কয়েকজন নাগরিক রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তির ঘোষণায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বলে এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৬ বছর বয়সী ওলেক্সান্দর পেত্রেঙ্কো বলেন, তাঁর ধারণা, ট্রাম্প ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি, গোলাবর্ষণ ও বাড়িঘর ধ্বংসের চেয়ে তেলের বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম নিয়ে বেশি আগ্রহী। তাঁর মতে, আসন্ন নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর মাধ্যমে ভোটারদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।

মধ্য ইউক্রেনের ক্রোপিভনিতস্কি শহরের আর্থিক পরামর্শক ওকসানা ইয়াকুনিনাও ট্রাম্পের ঘোষণায় বিস্মিত হননি বলে এপিকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কাজ করছেন।

ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্বেগ ও নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার অঙ্গীকার

ট্রাম্পের ঘোষণায় ইউক্রেনের কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্র হতাশা প্রকাশ করেছে। তাদের উদ্বেগ, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় দেশটির যুদ্ধ তহবিলকে শক্তিশালী করতে পারে।

সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেছেন, জ্বালানি থেকে পাওয়া অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় তাঁর দেশ এই চুক্তিতে দুঃখিত। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার সামরিক-শিল্প খাতকে লক্ষ্য করে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে।

জার্মান সরকারের মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস জানিয়েছেন, রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বার্লিন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে এবং আরও পদক্ষেপের জন্য ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। তিনি ইউক্রেনের প্রতি জার্মানির সমর্থনকে ‘অটল’ বলে বর্ণনা করেন।

পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি রাশিয়ার পক্ষে ঘোষিত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি এবং ইউক্রেনের হামলায় দেশটির তেল পরিশোধন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, রপ্তানির জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি কোথা থেকে আসবে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইউক্রেন আলোচনার সঙ্গে চুক্তির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার মিয়ামিতে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। একই দিন রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের চুক্তি ঘোষণা করেন ট্রাম্প।

জেলেনস্কি এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর বিশ্বাস, ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলকে কেবল আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর মতে, অংশীদারদের সঙ্গে এমন আচরণ ন্যায্য নয়।

একজন জ্যেষ্ঠ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা এপিকে জানিয়েছেন, চুক্তি ঘোষণার আগে ইউক্রেনীয় পক্ষ এ বিষয়ে অবগত ছিল না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও বলেন, ডিজেল চুক্তির ঘোষণা ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের আলোচক দলের মধ্যে চলমান আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদল ফ্লোরিডা ছেড়ে দেশে ফেরার পথে রয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা ও জ্বালানি নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ট্রাম্পের রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার ঘোষণা ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে ওয়াশিংটন যুদ্ধ অবসানের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে, অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাব্য চুক্তি ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় অংশীদারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

তবে চুক্তির বাস্তবায়ন, ঘোষিত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ এবং এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা কতটা এগোয় এবং রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগের নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র কী অবস্থান নেয়, তা পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP)–এর সরবরাহ করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।