ইরানের পূর্ণ সহায়তায় সৌদি আরবের উপর ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করছে -ইয়েমেনোর হুথি গোষ্ঠী -দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
রিয়াদ, সৌদি আরব | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
সৌদি আরবের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং কৌশলগত নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করেছে ইরান—এমন দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ)। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিবিরোধী জোটের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কথিত সহায়তা ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত ভূখণ্ড দখলের অভিযানে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকার, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে ইরানের সহায়তার ব্যাপ্তি এবং হামলাগুলোর সঙ্গে তেহরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য প্রতিবেদনে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই এসব অভিযোগকে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ইয়েমেন উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। গোষ্ঠীটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার, জ্বালানি স্থাপনা এবং বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে সৌদি রাজধানী রিয়াদে চালানো একটি হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে দেশজুড়ে অন্তত ১৯ জন নিহত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে হতাহতের এই দুই হিসাবের সময়সীমা ও পরিসরের পার্থক্য স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, অক্টোবর মাসে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হুথিরা ২০ বার হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা দেশটির বিমান চলাচল, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ইয়েমেনে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের সাবেক গণতন্ত্রপন্থী কর্মী এবং লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) সহযোগী গবেষক বারাআ শিবান দাবি করেন, হিজবুল্লাহর সদস্য এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ইরান বহু বছর ধরে ইয়েমেনে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে।
২০১১ সালের ইয়েমেনের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তীকালে হুথিদের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত থাকা শিবানের মতে, হুথিরা বড় আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠার আগেই ইয়েমেনে তেহরানের সম্পৃক্ততা শুরু হয়েছিল।
তিনি বলেন, আরব বসন্তে অংশ নেওয়া তরুণ ইয়েমেনিদের গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে আলোচনার কথা বলে লেবাননের বিভিন্ন সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, এসব সম্মেলনের মাধ্যমে কিছু কর্মী হিজবুল্লাহর সদস্যদের সংস্পর্শে আসেন এবং পরে ইরানের বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন।
শিবান আরও দাবি করেন, ‘আবু হাদি’ ছদ্মনামে পরিচিত এক আইআরজিসি কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েকজন কর্মীর যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তা ছিলেন হাসান ইরলু, যিনি ২০২০ সালে সানায় হুথি কর্তৃপক্ষের কাছে ইরানের রাষ্ট্রদূত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরলু ইরানের কুদস ফোর্সের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মারা যান।
শিবানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে এই কার্যক্রমে হিজবুল্লাহর ভূমিকা বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা আরও দৃশ্যমান হয়। তবে এসব নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ ব্যাপ্তি ইরান ইন্টারন্যাশনাল স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল?
শিবানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সৌদি আরবে হুথিদের হামলা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আরেকটি পর্যায় নির্দেশ করতে পারে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবে তেহরান হুথিদের ব্যবহার করছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান হুথিদের এমন একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। তবে হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যও রয়েছে—বিশেষ করে ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর প্রতি সৌদি সমর্থন বন্ধ করতে রিয়াদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
এই পরিস্থিতিতে ইরান ও হুথিদের স্বার্থের মধ্যে মিল থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত ও সামরিক কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ অভিন্ন হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
ওমানে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব জানিয়েছে, হুথিরা জুলাই মাসে ওমানে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি বলেন, সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আগে দুই পক্ষের অমীমাংসিত মতপার্থক্য নিরসনের লক্ষ্যে রিয়াদ আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক ফাতিমা আল-আসরার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মন্তব্য করেন, হুথিদের আলোচনায় অনীহার পেছনে তেহরানের কৌশলগত হিসাব ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের কৌশলগত প্রভাব বজায় থাকতে পারে।
তবে হুথিদের আলোচনায় অংশ না নেওয়ার কারণ সম্পর্কে সংগঠনটির নিজস্ব বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পূর্ণাঙ্গ অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য পরিবহন এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
শিবানের মতে, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টির মাধ্যমে ইরান যে কৌশলগত প্রভাব অর্জন করেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তেহরান বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও চাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে এটি তাঁর বিশ্লেষণ; ইরানের ঘোষিত সরকারি নীতি হিসেবে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কম্পাউন্ডে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনায় ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ পাঁচজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। তাইজের আশপাশে হুথিদের অগ্রযাত্রার কারণে সংঘর্ষ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব
সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, বিমান চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, ইরান, হুথি গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
শিবানের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। তবে সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামরিক পদক্ষেপ, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবে হুথিদের হামলা এবং এতে ইরানের কথিত সহায়তার অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তুলে ধরছে। একই সঙ্গে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই, হতাহতের সঠিক হিসাব এবং আলোচনার নতুন উদ্যোগের অগ্রগতি পরিস্থিতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ), ইরান ইন্টারন্যাশনাল এবং প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সৌদি ও ইয়েমেনি সূত্র।









