ফ্রান্সজুড়ে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই লুটপাট ও সহিংসতাকারীদের কঠোর হাতে দমনের ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বলেন- “কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়
প্যারিস, ফ্রান্স | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ফ্রান্সজুড়ে চলমান উত্তেজনা, সহিংস বিক্ষোভ, দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও লজ্জা প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। একই সঙ্গে লুটপাটকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, অপরাধীদের তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
রোববার জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে ম্যাখোঁ বলেন, সহিংস বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ‘প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়ার’ চেষ্টা করছে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, বৈধ দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো ব্যক্তিদের সঙ্গে ভাঙচুর, ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাটে জড়িতদের এক করে দেখা যাবে না।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটির বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন গ্রেপ্তার, আহত প্রায় এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ কর্মকর্তা ও জেন্ডারমের সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
কয়েক বছরের মধ্যে ফ্রান্সে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নগর সহিংসতার ঘটনাগুলোর মধ্যে শনিবারের পরিস্থিতিকে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তারা নজিরবিহীন সহিংসতার মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন ম্যাখোঁ।
তিনি বলেন, “গতকাল বিভিন্ন শহরে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তারা তাদের পেশাদারত্ব সত্ত্বেও নজিরবিহীন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।”

নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি, তবে জরুরি অবস্থা নয়
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ম্যাখোঁ। তবে তাঁর ভাষণে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা বা কারফিউ জারির কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি ‘সংকট মোকাবিলা ইউনিট’ গঠনের কথাও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ম্যাখোঁ বলেন, “আমি সরকারকে এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের ঐক্য প্রয়োজন, শান্ত থাকা প্রয়োজন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা প্রয়োজন।”
প্রেসিডেন্টের বক্তব্য নিয়ে সংশয়
প্যারিস থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নাতাশা বাটলার বলেন, ম্যাখোঁর ভাষণে তেমন কোনো বিস্ময়কর ঘোষণা ছিল না। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কিছু মানুষ প্রেসিডেন্টের একই ধরনের বক্তব্য শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
বাটলার প্রশ্ন তোলেন, এই ভাষণ বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে কতটা কার্যকর হবে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা
ফ্রান্সে চলমান সহিংসতা ও জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভ চলাকালে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ফরাসি সরকারকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জর্দান বারদেলা ম্যাখোঁর ভাষণকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘কাপুরুষোচিত’ বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, সরকার ফরাসি জনগণকে নতুন কোনো সমাধান দিতে পারছে না এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে—একদিকে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে বৈধ প্রতিবাদ ও অপরাধমূলক সহিংসতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা।
ম্যাখোঁ কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁর এই বক্তব্য চলমান উত্তেজনা প্রশমিত করতে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির ওপর।
সূত্র: আল জাজিরা; ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃত তথ্য









