উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় এবার সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধী প্রচারণার জন্য উচ্চ আওয়াজের মাইক লাগানোর ঘোষণা দিলেন উত্তর কোরিয় নেতা কিম জং এর বোন
পিয়ংইয়ং, উত্তর কোরিয়া | ২২ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচারণা জোরদার করতে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাউডস্পিকার স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন ও দেশটির প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং। চলতি অক্টোবরের শেষ নাগাদ এসব লাউডস্পিকার স্থাপনের কাজ শেষ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্তের প্রতিরক্ষা ও দুর্গ নির্মাণসংক্রান্ত এলাকা জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিদর্শনের পর কিম ইয়ো জং এ ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সামরিক ইউনিটগুলোও সীমান্ত এলাকায় কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।
পিয়ংইয়ংয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিউল হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে দক্ষিণ কোরিয়াকে অত্যন্ত গুরুতর ও কষ্টদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। তবে উত্তর কোরিয়ার এসব বক্তব্যের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান এবং সীমান্তে সংঘটিত ঘটনাগুলোর স্বাধীন যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ।
সতর্কতামূলক গুলি নিয়ে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
কিম ইয়ো জং অভিযোগ করেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় সতর্কতামূলক মাইক প্রচার চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে গুলি ছুড়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের গুলিবর্ষণ ছিল বৈধ ও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
দক্ষিণ কোরীয় সেনাদের উদ্দেশে কিম ইয়ো জং আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সতর্কতামূলক গুলির কারণে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সামরিক সদস্যের সামান্য ক্ষতিও হলে উত্তর কোরিয়ার বাহিনী কঠোর জবাব দেবে।
এ ধরনের বক্তব্য সীমান্তে ভুল বোঝাবুঝি, অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ কিংবা সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
উত্তেজনা কমাতে আলোচনার আহ্বান সিউলের
উত্তর কোরিয়ার হুমকির পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ও একত্রীকরণ মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে বিরোধ নিরসনে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সরকার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বৈরিতা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সীমান্তে নতুন করে লাউডস্পিকার স্থাপনের ঘোষণা এবং সামরিক হুঁশিয়ারি সেই প্রচেষ্টার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
লাউডস্পিকার দুই কোরিয়ার দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার একটি পরিচিত মাধ্যম। অতীতে দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তের ওপারে কে-পপ সংগীত, আন্তর্জাতিক সংবাদ ও উত্তর কোরিয়াবিরোধী বার্তা প্রচার করত। পিয়ংইয়ং এসব সম্প্রচারের প্রতিবাদ জানিয়ে পাল্টা লাউডস্পিকার ব্যবহার করেছে।
সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের সম্প্রচার শুধু প্রচারণার বিষয় নয়; এটি দুই দেশের রাজনৈতিক বিরোধ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবিশ্বাসেরও প্রতিফলন।
কোরীয় যুদ্ধের অস্ত্রবিরতির পরও অমীমাংসিত বৈরিতা
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে। এরপর দুই দেশের মধ্যে ডিমিলিটারাইজড জোন (DMZ) বা অসামরিকীকৃত অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানোর পরিবর্তে অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে সংঘাত থামানো হয়েছিল; ফলে দুই কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক বৈরিতা পুরোপুরি দূর হয়নি।
২০২৪ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা, ব্যারিকেড নির্মাণ এবং কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের মতো প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ জোরদার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সীমান্তে দেশটির অবস্থান আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যে মাইন বিস্ফোরণ নিয়েও দুই কোরিয়ার মধ্যে নতুন বিরোধ দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, অসামরিকীকৃত অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনের কারণে গত মাসে একটি বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হন।
তবে এ ঘটনায় দায় অস্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, সিউলের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও সাজানো।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে মাইন বিস্ফোরণের জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিউলের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোরীয় যুদ্ধের অস্ত্রবিরতি চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন।
দক্ষিণ কোরিয়া এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানাতেও প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা না বাড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ
সীমান্তজুড়ে লাউডস্পিকার স্থাপনের প্রস্তুতি, মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সামরিক হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে দুই কোরিয়ার সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ নিরাপত্তা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘনিষ্ঠভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েন থাকা সীমান্তে সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ, প্রচারণামূলক সম্প্রচার এবং প্রতিশোধের হুমকি ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ পরিস্থিতিতে যোগাযোগের কার্যকর ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর কোরিয়া লাউডস্পিকার স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সীমান্ত এলাকায় মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা আরও জোরদার হতে পারে। তবে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপ, সামরিক যোগাযোগ এবং আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনার ওপর।
সূত্র: সিএনএন; দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা, একত্রীকরণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন।
সম্পাদকীয় নোট: উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্ত-সংক্রান্ত অভিযোগ, সামরিক হুঁশিয়ারি এবং মাইন বিস্ফোরণের দায় নিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ছাড়া কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।









