আফগানিস্তানে তালিবান শাসনের পাঁচ বছর,নারীর শিক্ষা-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের বাস্তবতা -BBC News এর আয়নায়
কাবুল, আফগানিস্তান | ২৪ আগস্ট ২০২৬ | The Global Journal
আফগানিস্তানে তালিবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার প্রায় পাঁচ বছর পর দেশটির নারী অধিকার, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। BBC-এর দুই বছরব্যাপী অনুসন্ধানে তালিবান সরকারের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের ওপর তাদের নীতির প্রভাবের বেশ কিছু চিত্র উঠে এসেছে।
২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন-সমর্থিত আফগান সরকার পতনের পর তালিবান ক্ষমতা গ্রহণ করে। সে সময় নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ বজায় রাখার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নারীদের কর্মক্ষেত্র, চলাফেরা ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়া তরুণীর ঘটনা
উত্তর আফগানিস্তানে BBC-এর অনুসন্ধানের সময় গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদির কার্যালয়ে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী তার স্বামীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। তরুণীর অভিযোগ, তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে তাকে মারধর ও নির্যাতন করেছেন।
তালিবান কর্মকর্তা সারহাদি তাকে সংসার টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু তরুণী নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
তিনি বলেন, “একসঙ্গে থাকার কোনো সুযোগ থাকলে আমি এখানে আসতাম না… আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তরুণীর বক্তব্যের পর সারহাদি নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে BBC-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওই ঘটনার মাধ্যমে তালিবান নিয়ন্ত্রিত সমাজে নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও আইনি অধিকার নিয়ে বিদ্যমান সংকটের একটি চিত্র সামনে আসে।
শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের সংকোচন
তালিবান সরকার নারীদের অধিকারকে শরিয়াহর কাঠামোর মধ্যে নিশ্চিত করার দাবি করে। তবে মেয়েদের মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা বন্ধ থাকা এবং নারীদের কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
তালিবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ BBC-কে বলেন, নারীদের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং এর জন্য একটি “শরিয়াহভিত্তিক সমাধান” প্রয়োজন।
নারীদের সরকারি অফিসে কাজের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, এতে অনৈতিকতার সৃষ্টি হতে পারে এবং নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ
আফগানিস্তানে সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রেও চাপ ও বিধিনিষেধের অভিযোগ রয়েছে। BBC-এর সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন সাংবাদিক জানান, তালিবানের গোয়েন্দা সংস্থা এস্তিখবারাত তাদের তলব বা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
তালিবান মুখপাত্র মুজাহিদ বলেন, আফগানিস্তানের গণমাধ্যমকে ইসলামি আইন ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে সম্প্রচার করতে দেওয়া হবে না।
কান্দাহারে পরিস্থিতি আরও কঠোর বলে BBC-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সেখানে পুরুষদের দাড়ি রাখার বিধিনিষেধ রয়েছে এবং রেডিওতে গান কিংবা নারীদের কণ্ঠ সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সাবেক যোদ্ধাদের নতুন ভূমিকা
BBC-এর প্রতিবেদনে তালিবানের সাবেক যোদ্ধাদের বর্তমান ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। কাবুলের তালিবান কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বদর জানান, অতীতে তিনি রাজধানীতে আত্মঘাতী হামলাকারীদের কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বর্তমানে তালিবান প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী এসব সাবেক যোদ্ধার অতীত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অনেকেই বিস্তারিত আলোচনা এড়িয়ে যান।
২০০১ সালের আগে তালিবানের প্রথম শাসনামলে বামিয়ানে প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের ঘটনাতেও সারহাদির ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। BBC-এর প্রতিবেদনে তিনি নিজেই দাবি করেন যে মূর্তিটি ধ্বংসের কাজে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।
অভ্যন্তরীণ সমালোচনার চিত্র
তালিবান সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি অনুষ্ঠানে সুলতান মোহাম্মদ তালাই প্রকাশ্যে মেয়েদের স্কুল পুনরায় চালুর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিক্ষা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তার বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং তার মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরে তিনি BBC-কে জানান, মেয়েদের স্কুল পুনরায় চালুর বিষয়ে তিনি আরও কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে বেশি কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকট
নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার পাশাপাশি আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির কারণে দেশটিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব এখনও ব্যাপক।
BBC-এর সঙ্গে কথা বলা তালিবান কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সরকার এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে পানি, রাস্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের অভাবকে তাদের প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
‘শিক্ষিত নারীদের ভয় পায় তালিবান’
তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর প্রতিবাদ করা হোদা নামের এক নারী BBC-কে বলেন, নারীরা বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নেবে না।
তার মতে, তালিবান শিক্ষিত নারীদের ভয় পায় এবং এ কারণেই নারীদের ওপর শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “নারীরা এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না। তারা হয়তো আরও বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, কিন্তু এটা চিরকাল এভাবে থাকবে না।”
পাঁচ বছর পর প্রশ্ন
তালিবানের দ্বিতীয় দফার শাসনের প্রায় পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দেশটি কি এমন একটি শাসনব্যবস্থার দিকে এগোবে যেখানে শরিয়াহর তালিবান ব্যাখ্যাই রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি থাকবে, নাকি নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশ ও নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে?
BBC-এর অনুসন্ধানে তালিবান কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, নারী ও সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—আফগানিস্তানে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
The Global Journal-এর পর্যবেক্ষণ: আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ শুধু তালিবান সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নয়, বরং নারী শিক্ষা, নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির ওপরও নির্ভর করবে।
সূত্র: BBC News; অতিরিক্ত প্রতিবেদন—হাফিজুল্লাহ মারুফ





