লুলা দা সিলভার কাছে নির্বাচনে পরাজয়ের পরপরই ব্রাজিল ছেড়ে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাভিও বলসোনারো!মিয়ামিতে পৌঁছানোর গোপনীয়তার খবর ঘিরে বাড়ছে ব্যাপক চাঞ্চল্য
মিয়ামি, যুক্তরাষ্ট্র | ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজয়ের পর পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন ব্রাজিলের সিনেটর ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ফ্লোরিডার মিয়ামির ওপা-লক্কা নির্বাহী বিমানবন্দরে তাঁর ব্যক্তিগত বিমান অবতরণ করে বলে জানিয়েছে সিএনএন ব্রাজিল। বিমান থেকে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে নামার দৃশ্যও টেলিভিশনের ভিডিওতে দেখা গেছে। পরে পরিবারের সদস্যদের ছাতা দিয়ে মুখ আড়াল করে বিমানবন্দর ছাড়তে দেখা যায়।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগ এমন সময়ে ঘটল, যখন ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত চলছিল। সিএনএনের প্রতিবেদনে তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় তিনি দেশ ছেড়েছেন। তবে ব্রাজিল ছাড়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ
সিএনএনের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লাভিও বলসোনারো ও তাঁর পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমোদন দিয়েছেন। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ব্রাজিলের আদালতের পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন। এরপরও পরিবারটিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে দুই মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছিলেন, ফ্লাভিও, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের জন্য ভিসা দেওয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলসোনারো পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়ে সম্মতি দেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তিনি তাঁদের ‘ভালো মানুষ’ বলে উল্লেখ করেন এবং ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘অদ্ভুত’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেন।
তবে দেশ ছাড়ার আগে ট্রাম্প ও ফ্লাভিওর মধ্যে সরাসরি ফোনে কথা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ব্রাজিল ছাড়ার আগে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ
ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস ফ্লাভিওকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সিএনএন ব্রাজিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার পর দেশটির ফেডারেল পুলিশ তাঁর ব্রাজিলীয় পাসপোর্ট বাতিল করে।
ফ্লাভিও এর আগে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে বলেন, পুলিশ তাঁকে আদালতের নির্দেশের কথা সরাসরি জানিয়েছিল এবং দেশ ছাড়তে নিষেধ করেছিল। একই ভিডিওতে তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেন।
তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর খবর প্রকাশিত হয়। আদালতের নির্দেশ অমান্য করার বিষয়টি সম্ভাব্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে আইনবিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশ ছাড়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না; তবে আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে পরবর্তী সময়ে নতুন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আর্জেন্টিনা হয়ে ইকুয়েডর, তারপর ফ্লোরিডা
ফ্লাভিওর যাত্রাপথ নিয়ে প্রথমে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে জানিয়েছিল, তিনি আর্জেন্টিনা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে আর্জেন্টিনা সরকার প্রথমে বলেছিল, তাঁর দেশটিতে প্রবেশের কোনো নথি তাদের কাছে নেই।
পরে আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, ফ্লাভিও, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ে মঙ্গলবার রাতে ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন। তাঁদের কাছে বৈধ ভ্রমণ নথি ছিল এবং প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা ছিল না বলে কর্তৃপক্ষ জানায়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরিবারটি পরে একটি ব্যক্তিগত বিমানে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলে যায়। সেখানে জ্বালানি নেওয়ার পর বিমানটি ফ্লোরিডার উদ্দেশে যাত্রা করে। সিএনএন ব্রাজিলের প্রতিবেদনে বিমানটির মিয়ামির ওপা-লক্কা নির্বাহী বিমানবন্দরে অবতরণের কথা বলা হয়েছে।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের তদন্ত
ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালতে চলমান তদন্তের মধ্যে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি তদন্ত সম্ভাব্য অবৈধ অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আরেকটি তদন্ত তাঁর বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে নিয়ে নির্মিত ডার্ক হর্স নামের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রের অর্থায়ন ঘিরে।
ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের সন্দেহ, চলচ্চিত্রটির অর্থায়নের সঙ্গে ব্যাংকো মাস্টারের অর্থের সম্পর্ক থাকতে পারে। ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ধসে পড়ে এবং প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের পনজি-ধাঁচের আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে এর নাম জড়ায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্লাভিও বলসোনারো সব ধরনের অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তদন্তাধীন অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্রাজিলীয় রক্ষণশীলদের সঙ্গে যোগ
যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার ফলে ফ্লাভিও বলসোনারো দেশটির বাইরে অবস্থানরত ব্রাজিলীয় রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যুক্ত হলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো, ব্রাজিলের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান আলেকজান্দ্রে রামাজেম এবং পডকাস্টার পাওলো ফিগেইরেদো।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগ তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চলে যাওয়ার ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জাইর বলসোনারো সে সময় অরল্যান্ডোতে প্রায় তিন মাস অবস্থান করেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে জাইর বলসোনারো ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্টকে পরে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
লুলার প্রতিক্রিয়া ও বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ
ফ্লাভিওর দেশত্যাগের সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা। মঙ্গলবার সমর্থকদের এক সমাবেশে তিনি এ ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অভিযোগের মুখোমুখি হলে ফ্লাভিওর দেশে থেকে আদালতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা উচিত ছিল।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রথমদিকে ফ্লাভিও ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং তা বাতিলের আবেদন করার কথা বলেছিলেন। পরে তাঁর লিবারেল পার্টি নির্বাচনের ফল স্বীকার করে, যদিও দলের নেতা ভালদেমার কোস্তা নেটো বলেন, উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণার ব্যবস্থাপক রজেরিও মারিনহো জানিয়েছেন, সিনেটরের দেশত্যাগে দলটি বিস্মিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের দিনও ফ্লাভিওকে বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফ্লাভিও বলসোনারোর পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো ব্রাজিলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আদালতের পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ, চলমান তদন্ত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার খবর ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে তাঁর দেশত্যাগের উদ্দেশ্য, তদন্তের অভিযোগ এবং সম্ভাব্য আইনি পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি। এই ঘটনার পর ব্রাজিলের বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ব্রাজিল সম্পর্কের ওপর এর প্রভাবও নজরে থাকবে।
সূত্র: CNN, CNN Brasil, Reuters এবং আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য।









