তবে কি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরই হচ্ছেন ‘ইসলামিক ন্যাটো’র কমান্ডার? -তুরস্ক বলছে গুরুত্ব পাবে সামরিক প্রধান'রা
আঙ্কারা | ১৩ আগস্ট ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সম্ভাব্য সামরিক নেতৃত্বের কাঠামো। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সামরিক প্রধানদের নিয়ে একটি সমন্বিত রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ‘ইসলামিক ন্যাটো’র কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো সরকারি ঘোষণা এখনো আসেনি। ‘ইসলামিক ন্যাটো’ শব্দটিও মূলত রাজনৈতিক ও বিশ্লেষণাত্মক বর্ণনা; চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনা
এর আগে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছিলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে প্রযুক্তিগতভাবে তুলনীয়। ন্যাটোর এই ধারায় একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে জোটের সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফিদান আরও জানান, চুক্তি পরিচালনার জন্য মন্ত্রী পর্যায়ের একটি কমিটি এবং সৌদি আরবে একটি সাধারণ সচিবালয় গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বক্তব্যে এই কাঠামোর সঙ্গে তিন দেশের সামরিক প্রধানদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
তিন দেশের সামরিক প্রধানদের নিয়ে নতুন কাঠামো
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান বা সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডারদের সমন্বয়ে কৌশলগত রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
তিন দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সমন্বয় নিশ্চিত করাই হবে এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে আঙ্কারা।
চুক্তির আওতায় তিন দেশ যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করবে।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা কতটা যৌক্তিক?
তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লেও এটিকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য সামরিক জোট বলা অকালপক্ব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের পাকিস্তান কর্মসূচির প্রধান ঐশ্বরিয়া সোনাভানে এর আগে Firstpost-কে বলেছিলেন, তিন দেশের মধ্যে ন্যাটোর মতো সামরিক interoperability বা আন্তঃকার্যক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো তৈরি হয়নি।
তুরস্ক দীর্ঘদিনের ন্যাটো সদস্য এবং সামরিক জোট পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থায় চীনা প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে এবং সৌদি আরব মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে তিন দেশের সামরিক ব্যবস্থা একীভূত করতে সময় লাগতে পারে।
তবে তুরস্কের বক্তব্য অনুযায়ী, যৌথ মহড়া ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই আন্তঃকার্যক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
যৌথ মহড়া থেকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি
চুক্তির আওতায় স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়া পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন এবং অন্যান্য মানববিহীন সামরিক ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যৌথ উন্নয়ন ও উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক সহায়তা।
বিশেষভাবে মানববিহীন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে তুরস্ক।
আসিম মুনিরের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
নতুন কাঠামোতে তিন দেশের সামরিক প্রধানরা যুক্ত হলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখবেন। তবে তাঁকে জোটের একক কমান্ডার করার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
ফলে বর্তমানে ‘ইসলামিক ন্যাটো’র কমান্ডার হিসেবে আসিম মুনিরের সম্ভাবনা একটি বিশ্লেষণাত্মক জল্পনা, নিশ্চিত নিয়োগ নয়।
চুক্তির বাস্তব কাঠামো, কমান্ড ব্যবস্থা এবং যৌথ সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্পষ্ট হওয়ার পরই বোঝা যাবে তিন দেশের নতুন নিরাপত্তা কাঠামো কতটা ন্যাটোর আদলে এগোচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতাকে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ ‘ইসলামিক ন্যাটো’তে রূপ দিতে হলে সামরিক সমন্বয়, প্রযুক্তি, কমান্ড কাঠামো ও আন্তঃকার্যক্ষমতার ক্ষেত্রে তিন দেশকে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।





