Breaking
একদিকে ১০০% শুল্কের হুমকি,অন্যদিকে কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর করতে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে জেডি ভ্যান্সের ফোনকল—যেন ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের এক জটিল কূটনীতি

একদিকে ১০০% শুল্কের হুমকি,অন্যদিকে কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর করতে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে জেডি ভ্যান্সের ফোনকল—যেন ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের এক জটিল কূটনীতি

Share:

Written By

News Desk

একদিকে ১০০% শুল্কের হুমকি,অন্যদিকে কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর করতে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে জেডি ভ্যান্সের ফোনকল—যেন ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের এক জটিল কূটনীতি

নয়াদিল্লি | ৯ আগস্ট ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল

রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের জ্বালানি আমদানি নিয়ে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কঠোর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার চাপ, অন্যদিকে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ—দুই ধরনের বার্তার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এ সময় দুই দেশের ‘কমপ্রিহেনসিভ গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ আরও জোরদার করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ফোনালাপে ভ্যান্স ও তাঁর স্ত্রী উষা ভ্যান্সের সন্তানের জন্ম উপলক্ষে অভিনন্দনও জানান তিনি এবং তাঁদের পরিবারের জন্য শুভকামনা জানান।

রাশিয়ার তেল নিয়ে ১০০% পর্যন্ত শুল্কের চাপ

মোদি–ভ্যান্স ফোনালাপের সময়ই রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয় নিয়ে ভারতের ওপর মার্কিন চাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মার্কিন সিনেটে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। বিলটি আইনে পরিণত হলে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট পেতে পারেন।

ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় জ্বালানি ক্রেতা হওয়ায় সম্ভাব্য এই পদক্ষেপের প্রভাব নয়াদিল্লির ওপর পড়তে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিলটি এখনো পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়নি এবং শুল্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, রাশিয়ার জ্বালানি কিনে যেসব দেশ মস্কোর রাজস্ব প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করছে, তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার অর্থায়ন দুর্বল করা সম্ভব হবে।

চাপের পাশাপাশি কেন কৌশলগত অংশীদারত্ব?

ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

রাশিয়ার তেল নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে শুধু একটি বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে দেখছে না। ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রেই ভারতকে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিতে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ এবং কৌশলগত সহযোগিতা—দুই দিকই দৃশ্যমান।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সম্পর্ক পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করা হলেও, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থে নয়াদিল্লির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখাও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্য চুক্তি বড় পরীক্ষার মুখে

ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল করা এবং বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির ভিত্তি তৈরিই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু রাশিয়ার জ্বালানি নিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন শুল্কনীতি সেই আলোচনায় নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে চাইছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্কও বজায় রাখছে।

প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা অব্যাহত

বাণিজ্যিক ও জ্বালানি ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

দুই দেশ প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং কৌশলগত সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়।

ভারতকে কি চাপ দিয়ে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র?

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন ভারতের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব খাটানোর পাশাপাশি কৌশলগত সম্পর্কও অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইছে।

রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা ভারতের জন্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ভ্যান্স–মোদির সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্ব ভেঙে দিতে আগ্রহী নয়।

বিশ্লেষণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে ‘চাপ ও অংশীদারত্ব—দুইয়ের সমন্বয়’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, ভারতের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করার পাশাপাশি চীনকেন্দ্রিক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ভারতকে পাশে রাখার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

তবে ভারত কতটা মার্কিন চাপ মেনে নেবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক কতটা বজায় রাখবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আগামী দিনের ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে এই ভারসাম্য: নয়াদিল্লি কি রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক বজায় রেখেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে পারবে?