এবার কপাল পুড়ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের! যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাল রিপাবলিকান পার্টি, বড় রাজনৈতিক ধাক্কায় হোয়াইট হাউস
ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র | ৪ নভেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাজিত করে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের আসন নিজেদের দখলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই জয় নিশ্চিত করেছে দলটি। অন্যদিকে, নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ছয়টি আসন নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। পাশাপাশি নর্থ ক্যারোলাইনা ও ওহাইওতেও রিপাবলিকানদের আসন হাতছাড়া হয়েছে। এই ফলাফল মার্কিন সিনেটের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেল ডেমোক্র্যাটরা
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের ফলে আগামী জানুয়ারি থেকে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারের সামনে। নির্বাচনের পর তিনি বলেন, মার্কিন ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মার্কিন জনগণের জন্য স্বস্তি আসছে।’
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় নিয়োগ অনুমোদন এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নীতিগত উদ্যোগের ওপরও বাড়তি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে দলটি।
১০০ সদস্যবিশিষ্ট মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা বর্তমানে ৫২টি আসনে এবং রিপাবলিকান পার্টি ৪০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে।উচ্চকক্ষের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসেও ডেমোক্র্যাটদের জয়ের শক্তিশালী ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে। ৪৩৫টি আসনের এই পরিষদে ম্যাজিক ফিগার বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। এই লড়াইয়েও বেশ স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বিরোধী দল।ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে ১৮৪টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে, বিপরীতে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে গেছে ১১৩টি আসন।

গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের পরাজয়
নির্বাচনে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেন। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন। ওহাইওতে সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়ে আবারও সিনেটে ফিরছেন।
সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুজ জয়ী হয়ে রাজ্যটির প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম নির্বাচিত নারী সিনেটর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেন। কানসাসেও ডেমোক্র্যাটদের জয় সিনেটের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও লড়াই
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের জয় নিশ্চিত হলেও প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ৪৩৫ সদস্যের এই নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন।
এপি জানিয়েছে, ভোট গণনার পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে সাতটির বেশি আসন রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিজেদের দখলে নিয়েছে। ফলে নিম্নকক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন
এপি ভোটার জরিপ অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সরকারের দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেক ভোটার ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের আরও কঠোর নজরদারি চেয়েছেন।
রিপাবলিকান নির্বাচনী প্রচারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও দলের পরাজয়ের জন্য ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রশাসনের নীতিমালাকে দায়ী করেছেন। তাঁদের মতে, টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যে পরাজয় প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন।
ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসনে বাড়বে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের মেয়াদে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও শুনানি আয়োজনের পাশাপাশি বিচারক এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
তবে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল তিনি গ্রহণ করতে প্রস্তুত এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করবেন। একই সঙ্গে তিনি ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবিত উদ্যোগে ভেটো দেওয়ার সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন। ফলে আগামী দিনগুলোতে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং আইনপ্রণয়নসংক্রান্ত অচলাবস্থার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত ফলাফলও যদি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যায়, তাহলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ট্রাম্প প্রশাসনকে শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP), আলজাজিরা।









