প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ইরানি ষড়যন্ত্র নিয়ে ইসরায়েলের সতর্কবার্তা যাচাই করতে পারেনি মার্কিন গোয়েন্দারা -বার্তা সংস্থা রয়টার্স
ওয়াশিংটন | ১৪ আগস্ট ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের কথিত ষড়যন্ত্র নিয়ে ইসরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু তথ্যকে মার্কিন গোয়েন্দারা ‘কম আত্মবিশ্বাসের’ তথ্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক গোয়েন্দা চ্যানেলের মাধ্যমে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে। এসব সতর্কবার্তায় স্নাইপার হামলা, জনসমাগমে ছুরি হামলা এবং অন্যান্য হত্যাচেষ্টার কথিত পরিকল্পনার উল্লেখ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সরাসরি হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে ব্রিফ করেন।
ন্যাটো সম্মেলনের আগে ট্রাম্পকে হত্যার সতর্কবার্তা
সবচেয়ে বিস্তারিত সতর্কবার্তাগুলোর একটি দেওয়া হয় তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের আগে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করেছিলেন যে, তুরস্ক সফরের সময় ইরান ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে। এমনকি এয়ার ফোর্স ওয়ানকে কাঁধ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছিল।
তবে রয়টার্সের উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই নির্দিষ্ট হুমকির স্বাধীন কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি।
এক তুর্কি কর্মকর্তাও রয়টার্সকে জানান, তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই কথিত হুমকির পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি এবং তাদের মূল্যায়ন মার্কিন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল।
গোপনে বিমান পরিবর্তন করেছিলেন ট্রাম্প
হুমকিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে হোয়াইট হাউস ও সিক্রেট সার্ভিস অতিরিক্ত সতর্কতা গ্রহণ করে।
এরই অংশ হিসেবে তুরস্ক সফর শেষে ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনাটি আগে প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
ট্রাম্প পরে নিজেই বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে অন্য বিমানে যেতে হয়েছিল।
সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের আশঙ্কা
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছে যে, ২০২০ সালে ইরানি সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি হত্যার নির্দেশ দেওয়ার জন্য ইরান ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাইতে পারে।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি গোয়েন্দাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উপস্থাপিত বেশ কিছু নির্দিষ্ট হত্যাচেষ্টার তথ্য সিআইএ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মতপার্থক্য
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়নের পার্থক্য নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূল্যায়ন করেছিল যে ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ করছে না। অন্যদিকে ইসরায়েল তেহরানকে একটি গুরুতর ও জরুরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানবিষয়ক নীতিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই সঙ্গে মার্কিন সংস্থাগুলো ইসরায়েলি তথ্যের স্বাধীন যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখিও হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য কীভাবে যাচাই করে যুক্তরাষ্ট্র?
রয়টার্সের উদ্ধৃত কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য সাধারণত সিআইএ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (NSA) এবং অন্যান্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে পাঠানো হয়।
এরপর এসব তথ্য অন্যান্য গোয়েন্দা উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে তথ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তখন তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মাত্রার মূল্যায়ন করা হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন
রয়টার্সের প্রতিবেদনে মার্কিন গোয়েন্দা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, গত বছর সিআইএ এবং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (NIC)-এর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ও বিনিময় কমে যায়। NIC হলো মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের প্রধান বিশ্লেষণধর্মী সংস্থা এবং এটি অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ODNI)-এর অধীনে কাজ করে।
কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরানসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিভিন্ন গোয়েন্দা উৎসের সমন্বিত মূল্যায়নের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
হোয়াইট হাউস ও সিআইএ রয়টার্সের প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্রও গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রভাবিত করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করে।
ঘটনাটি এমন সময় সামনে এলো, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সামরিক নীতি এবং ট্রাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ট্রাম্পকে হত্যার কথিত ইরানি ষড়যন্ত্রগুলোর প্রকৃত মাত্রা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।





