নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। এছাড়া প্রায় ৪,২০০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।
নেপাল–তিব্বত | ২৯ আগস্ট ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
নেপাল–তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে ৬৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। জীবিতদের সন্ধানে নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দল কাদা, বরফ ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
দুর্যোগের সময় বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত সুনামির মতো দ্রুতগতিতে পাহাড়ি জনপদ ও গ্রামগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে। এতে বহু স্থাপনা, যানবাহন এবং যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধারকারী দলের আশঙ্কা, কিছু মরদেহ পানির প্রবল স্রোতে ভেসে নেপাল থেকে ভারতের নদীপথেও চলে যেতে পারে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের তালিকায় নতুন করে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী যুক্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা করা পর্যটক, ট্রেকার এবং তীর্থযাত্রীদের একটি অংশও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
কাঠমান্ডুতে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। বিভিন্ন স্থানে নিখোঁজদের ছবি ও নামসংবলিত পোস্টার টাঙানো হয়েছে।

হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যা
যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS)-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি হিমবাহ ধসের পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হয়ে এই ভয়াবহ দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর এটিকে নেপালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বরফ ও কাদার প্রবল স্রোতে বিভিন্ন এলাকায় বড় জলাধার ও হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি উদ্ধারকারী দলের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। তিব্বতের দিকে একটি জলাধার ভেঙে পড়ার আশঙ্কার পর নেপালি পুলিশ উদ্ধারকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
চীনের তিব্বত অংশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিয়েরং এলাকায় অতিরিক্ত বন্যার আশঙ্কায় একপর্যায়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় অভিযান আবার শুরু করা হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, ধ্বংসাবশেষের স্তূপে তৈরি একটি হ্রদের পানি উদ্ধারকাজ চলা এলাকায় উপচে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। পরে পানির স্তর কমে গেলে উদ্ধার কার্যক্রম আবার সুশৃঙ্খলভাবে চালানো সম্ভব হয়।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে বৈঠক করে নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এবং নেপালের জরুরি তৎপরতায় সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শতাধিক মানুষ আটকা
দুর্যোগের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নেপালি সেনাবাহিনী ত্রিশূলী–৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে থাকা মানুষের অবস্থান শনাক্ত করেছে এবং তাদের উদ্ধারের জন্য প্রবেশপথ খুঁজছে।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানান, প্রায় ৩৫০ জন কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ১০০ জনেরও বেশি মানুষ সেখানে আটকা থাকতে পারেন।
তিনি বলেন, আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হলেও টানেলের প্রবেশপথ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধার হওয়া কর্মীরা জানিয়েছেন, দুর্যোগের সময় পরিস্থিতি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নেয়। কর্মী বুদ্ধ তামাং একটি টানেলের ভেতরে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অন্য পাশে থাকা অনেক কর্মকর্তা পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যান।
নিখোঁজ স্বজনদের জন্য অপেক্ষা
নেপালের বিভিন্ন অস্থায়ী হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রে নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় রয়েছেন বহু পরিবার।
এক নিখোঁজ ব্যক্তির মা কুলা প্রিয়া বলেন, বন্যা তাঁর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তিনি সম্পদের পরিবর্তে শুধু তাঁর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।
নেপাল শুক্রবার ৫৭৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল। দেশটির দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১ হাজার ৯২৪ জন, যার মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি, তখনো যোগাযোগের বাইরে ছিলেন।
এদিকে ভারতের কর্তৃপক্ষ নেপাল থেকে আসা নদীতে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এগুলো বন্যায় ভেসে আসা নেপালের দুর্গত মানুষের মরদেহ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিব্বতেও বাড়ছে উদ্বেগ
চীনের তিব্বত অংশে তথ্যপ্রবাহ সীমিত হওয়ায় সেখানে সরকারি চীনা সূত্রের তথ্যই প্রধান। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে ৭ জন নিহত এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটক এবং ৪৯৯ জন চীনা বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কৈলাশযাত্রীরাও দুর্যোগের মধ্যে
নিখোঁজদের মধ্যে তিব্বতের কৈলাশ পর্বতের পথে থাকা বিভিন্ন দেশের তীর্থযাত্রীও রয়েছেন।
৪৬ বছর বয়সী শিবরঞ্জনী মুথুনাথন ৫৬ জন সহযাত্রীর সঙ্গে চীনা সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, যানজটের কারণে বাস থেমে আছে। পরে কুয়াশা, ধোঁয়া এবং আকস্মিক ধ্বংসাবশেষের স্রোত চারদিক থেকে তাঁদের ঘিরে ফেলে।
তিনি জানান, আশপাশের যানবাহন একের পর এক কাদা ও পানির স্রোতে ভেসে যায় বা চাপা পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা বাসের চালকের পাশ দিয়ে বেরিয়ে একটি পাহাড়ে উঠে প্রাণ রক্ষা করেন।
উদ্ধার অভিযানে এখন সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই
ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের পর নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান এখনো সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে চলছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু, নতুন করে বন্যার আশঙ্কা এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড উদ্ধারকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ মুহূর্তে নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।
সূত্র: নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, Xinhua, CCTV এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।





