অতঃপর বেজে উঠল নেতানিয়াহুর বিদায়ঘণ্টা! ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতা গাদি আইজেনকট!
জেরুজালেম, ইসরায়েল | ৮ নভেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় বিরোধী নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। এই সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি করলেও নতুন সরকার গঠন করতে আইজেনকটকে কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনে ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন চার দলের বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক দল। ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন।
নির্বাচনে কোনো জোটই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও সরকার গঠনের জন্য প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ সভায় ১২০ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে ৬৭ জন আইজেনকটের পক্ষে সমর্থন জানান। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ করেন ৪৬ জন আইনপ্রণেতা। এর ফলে নতুন সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পেয়েছেন আইজেনকট।

আরব দলগুলোর সমর্থনই হতে পারে বড় চাবিকাঠি
আইজেনকটের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা। নির্বাচনে রেকর্ড ১৯টি আসন পাওয়া এই দুটি দল তাঁর সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের সমর্থন পেলে আইজেনকটের বিরোধী শিবিরের মোট সমর্থন ৬৭-তে পৌঁছাতে পারে।
তবে আরব দলগুলোকে সরাসরি সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে আইজেনকটের জোটের ভেতরেই আপত্তি রয়েছে। বিশেষ করে ডানপন্থি নেতা আভিগদর লিবারম্যানের নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল বেইতেনু দল আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের বিরোধিতা করছে।
ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন পেলেও সরকার গঠনের প্রশ্নে জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা আইজেনকটের জন্য কঠিন হতে পারে।
অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা
সরকার গঠনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সমর্থন অর্জন করা। এই দুটি দলের সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৩। আইজেনকটের ৪৮ আসনের জোটের সঙ্গে তাদের সমর্থন যুক্ত হলে মোট আসনসংখ্যা ৬১-তে পৌঁছাবে।
তবে এই সমঝোতার পথেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য। অতি-অর্থোডক্স দলগুলো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে আইজেনকট ও তাঁর কয়েকজন রাজনৈতিক শরিক ইসরায়েলের সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ফলে সামরিক নিয়োগনীতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে এই পথেও সরকার গঠন জটিল হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার কতটা সম্ভব?
ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। দুই পক্ষের আসন একত্র করলে মোট সংখ্যা ৬৭-তে দাঁড়াবে।
তবে নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকট। ফলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল। আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিরোধী জোটে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু
নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব আইজেনকট পেলেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর লিকুদ পার্টি নেসেটের বৃহত্তম একক দল হিসেবে রয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইজেনকট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকেও সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের আইনপ্রণেতাদের নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করতে পারেন তিনি।
এদিকে সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
২৮ দিনের সময়সীমা, ব্যর্থ হলে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
সরকার গঠনের জন্য আইজেনকট প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁকে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিশ্চিত করে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পথ তৈরি করতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারলে ইসরায়েলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হলেও তাঁর বিদায় এখনো নিশ্চিত নয়। আরব দলগুলোর সমর্থন, অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং নিজের জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করতে পারলেই কেবল আইজেনকটের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম হবে। ইসরায়েলের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের নেতানিয়াহু যুগের অবসান ঘটিয়ে আইজেনকট কি সত্যিই নতুন সরকার গঠন করতে পারবেন?
সূত্র: Reuters, Associated Press (AP), The Times of Israel, Al Jazeera









