বিশ্ব ফুটবলের অদম্য শক্তি স্পেন,পাঁচ বছরে ১৬টি শিরোপা অর্জন
স্পোর্টস ডেস্ক | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
মাদ্রিদ, স্পেন | ১৯ জুলাই ২০২৬
স্পেন আবারও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আধিপত্যের প্রমাণ দিল। দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবার নিউ জার্সির বিশ্বকাপ ফাইনালে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে ‘লা রোহা’।
২০০৮ সালে ইউরো জয়ের দুই বছর পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারও একই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করল স্পেন। তবে এবারের অর্জন আরও বড়—পুরুষ ও নারী ফুটবল মিলিয়ে দেশটি গত পাঁচ বছরে জিতেছে মোট ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপীয় শিরোপা।
পুরুষ ও নারী ফুটবলে নজিরবিহীন আধিপত্য
স্পেনের নারী দল ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা দুইবার নেশনস লিগ জিতেছে। পুরুষ দল জিতেছে ২০২৩ সালের নেশনস লিগ, ২০২৪ সালের ইউরো এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ। পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২০ ও অলিম্পিক পর্যায়েও এসেছে একের পর এক সাফল্য।

ফলে স্পেন এখন এমন এক বিরল অবস্থানে, যেখানে দেশটির পুরুষ ও নারী—উভয় জাতীয় দলই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগে এই সাফল্যকে “একটি আধিপত্য” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, স্পেনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট ফুটবল সংস্কৃতি, যার ওপর দেশের সব স্তরের খেলোয়াড় ও কোচ বিশ্বাস করেন।
দে লা ফুয়েন্তের ‘জয়ের সংস্কৃতি’
২০২২ সালের ডিসেম্বরে স্পেনের প্রধান কোচ হিসেবে লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে নিয়োগ দেওয়ার সময় অনেকেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ, এর আগে তিনি কোনো বড় ক্লাবের প্রধান কোচ ছিলেন না।
তবে অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিন ধরে চেনার সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিনি মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে স্পেনকে নেশনস লিগ, ইউরো ও বিশ্বকাপ জেতান।
দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনের ফুটবল দর্শন এখন আরও পরিণত—বল দখল, দ্রুত পাসিং, ধৈর্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান। বর্তমানে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দলটি টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত, যা ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের জন্য দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
সাফল্যের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
স্পেনের এই আধিপত্য রাতারাতি তৈরি হয়নি। গত এক দশকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ, উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং একাডেমি-ভিত্তিক খেলোয়াড় তৈরির ফলে এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
নারী ফুটবলেও গত পাঁচ বছরে স্পেনের পরিবর্তন ছিল নাটকীয়। উন্নত সুযোগ-সুবিধা, বয়সভিত্তিক দল বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ফলে দেশটির নারী ফুটবল এখন বিশ্বসেরাদের কাতারে।
ভবিষ্যৎও স্পেনের
স্পেনের আধিপত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের তরুণ প্রতিভা। বিশ্বকাপজয়ী দলে লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসির মতো কিশোর তারকারা ইতোমধ্যেই নিজেদের ছাপ রেখেছেন।
বিশ্বকাপ ফাইনালে ইয়ামাল ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন। কুবারসিও ফাইনালে শুরুর একাদশে ছিলেন। ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে স্পেনই প্রথম দল, যারা একই ম্যাচে দুই কিশোর খেলোয়াড়কে শুরুর একাদশে নামিয়েছে।
সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্টের মতে, স্পেনের খেলার ধরন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার কাছাকাছি বিশ্বের আর কোনো দল এখনো যেতে পারেনি। আর ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির মতে, স্পেনের গড়ে তোলা পুরো ফুটবল কাঠামো তাদের আরও বহু বছর বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দেবে।
স্পেনের এই সাফল্য তাই শুধু একটি বিশ্বকাপ জয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল প্রকল্পের ফল। মাঠে শিরোপা, একাডেমিতে নতুন প্রজন্ম এবং পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগেই ধারাবাহিক সাফল্য—সব মিলিয়ে স্পেন এখন সত্যিই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে অদম্য শক্তিগুলোর একটি।
দ্য গ্লোবাল জার্নাল





