বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইমরান খানের মুক্তির দাবি, সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা—কতটা কঠিন সংকটে পাকিস্তান?
— গ্লোবাল জার্নাল | ইসলামাবাদ | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেলুচিস্তানে সশস্ত্র বিদ্রোহ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সম্ভাব্য দেশব্যাপী আন্দোলন এবং ভারতের সঙ্গে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক কূটনীতিতে দেশটির সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক রাজীব ডোগরা দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। Firstpost-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বেলুচিস্তান, ইমরান খান, সিন্ধু পানি চুক্তি, পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং চলচ্চিত্র ‘ধুরন্ধর’-এ পাকিস্তানি সমাজের উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে থাকলেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে তার প্রভাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তার সমর্থকদের দাবি, তাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখতে একাধিক মামলা ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, তিনি আদালতে দণ্ডিত একজন বন্দি এবং আইন অনুযায়ী কারাভোগ করছেন।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইমরান-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জাতীয় পরিষদে সরাসরি নির্বাচিত আসনের হিসাবে অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় এগিয়ে থাকলেও পিটিআই দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে পারেনি। পরবর্তীতে একটি জোট সরকার ক্ষমতায় আসে।
ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন, ইমরান মুক্তি পেলে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না। এমনকি ব্যক্তিগত বিরোধ পাশে রেখে সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনার কথাও তিনি বলেছেন। তবে এটি ইমরানের নিজের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি নয়—এ বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পিটিআই। দলটির খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি আদিয়ালা কারাগারের দিকে মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ফলে পাকিস্তানে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—একদিকে রাজপথে সম্ভাব্য সংঘাত, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা।

ইরান কূটনীতিতে সেনাপ্রধান আসিম মুনির
পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক গুরুত্বও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতায় সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকা সামনে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুনির তেহরান সফরের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। ট্রাম্প তাকে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পাকিস্তানের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
পরে মুনির পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভিকে সঙ্গে নিয়ে তেহরান সফর করেন। পাকিস্তান পরবর্তীতে জানায়, আলোচনায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য এই কূটনৈতিক ভূমিকা সহজ নয়। দেশটির একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ জড়িত। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর কৌশলগত সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে।
বেলুচিস্তান কি ইসলামাবাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে?
বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সাবেক কূটনীতিক রাজীব ডোগরার মতে, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের জন্য সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং শহরাঞ্চলের বাইরে তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
বেলুচিস্তানে **বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)**সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা দীর্ঘদিনের। ডোগরা মনে করেন, এসব গোষ্ঠী নিজেদের কার্যক্রম কতটা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারবে, তা নির্ভর করবে তাদের জনবল সংগ্রহ ও স্থানীয় সমর্থনের ওপর।
তিনি সতর্ক করেন, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বিএলএ একই সময়ে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠলে দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের প্রতি কঠোর হওয়ার পরামর্শ
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। রাজীব ডোগরা মনে করেন, চুক্তিটি ভারতের জন্য অন্যায্য ছিল এবং নয়াদিল্লির উচিত বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা।
তার মতে, ভারত শুধু চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েই থেমে গেলে চলবে না। পাকিস্তান যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পানি বণ্টনের বিষয়টি তুলে ধরছে, ভারতকেও চুক্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নিজেদের পানি নিরাপত্তার প্রয়োজন ব্যাখ্যা করতে হবে।
ডোগরা দাবি করেন, দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন জলসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি ভারতের পানি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে আরও দৃঢ় অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে পানি বণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে তার বিভিন্ন বক্তব্য তার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ; এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
করাচির সহিংসতার স্মৃতি ও ‘ধুরন্ধর’ প্রসঙ্গ
পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক রাজীব ডোগরা ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত করাচিতে দায়িত্ব পালন করেন। তার দাবি, সে সময় মুহাজির, বেলুচ ও পাঠান গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষ হতো এবং সম্পদ, মাদক ও অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত চলত।
তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৯৩ সালের বোম্বে বিস্ফোরণের তিন দিন পর করাচিতে একটি নৈশভোজে তিনি বিস্ফোরক ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেখতে পান। সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তিকে পরে টাইগার মেমন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। এটি তার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ; ঘটনাটির সব বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
চলচ্চিত্র ‘ধুরন্ধর’-এর প্রসঙ্গে ডোগরা পাকিস্তানি সমাজের একটি অন্ধকার ও সহিংস চিত্র ফুটিয়ে তোলার পক্ষে মত দেন। তার বক্তব্য চলচ্চিত্রের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এটিকে পাকিস্তানি সমাজের পূর্ণাঙ্গ বা সর্বজনীন চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা—স্বস্তি না নতুন নির্ভরতা?
পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সাম্প্রতিক উষ্ণতাকেও ডোগরা দীর্ঘ ইতিহাসের আলোকে দেখেছেন। তার মতে, পাকিস্তান অতীতে বিভিন্ন সময় নিজেদের কৌশলগত গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সুবিধা আদায় করেছে।
তিনি মার্কিন বিশ্লেষক ব্রুস রিডেল-এর মতো ব্যক্তিদের পাকিস্তান সম্পর্কে দীর্ঘদিনের সতর্কতার কথা উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, ওয়াশিংটন পাকিস্তানের জটিলতা সম্পর্কে অবহিত হলেও বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বারবার নীতিগত পরিবর্তন করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে ডোগরা বলেন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক স্বার্থও এই সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
একসঙ্গে একাধিক সংকটের মুখে পাকিস্তান
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংকটগুলো আলাদা নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইমরান খানের রাজনৈতিক প্রভাব, পিটিআইয়ের সম্ভাব্য গণআন্দোলন, বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ, টিটিপির নিরাপত্তা হুমকি, পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সামরিক নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা—সব মিলিয়ে ইসলামাবাদকে একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক একাধিক ফ্রন্ট সামলাতে হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের রাজনৈতিক আন্দোলন যদি বড় আকার ধারণ করে, তাহলে তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিপরীতে, ইমরান খানের পক্ষ থেকে সমঝোতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনায় রূপ নিলে উত্তেজনা কিছুটা কমার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সবশেষে বড় প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটগুলো সমাধান করে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজের বাড়তে থাকা ভূমিকা ধরে রাখতে পারবে, নাকি এক সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে অন্য সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠবে?
— গ্লোবাল জার্নাল | ইসলামাবাদ | ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সূত্র: Firstpost, Reuters ও আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন





